রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে শেষ হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, রামিসা হত্যা মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
রোববার (২৪ মে) সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপে’ তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার পর পালিয়ে যাওয়া আসামিকে সাত ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামি একদিনের মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সহযোগী অপরাধী হিসেবে তার স্ত্রীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা দ্রুত আদালতের অনুমতি নিয়ে ডিএনএ টেস্ট করিয়েছি। সেই টেস্ট তিন দিনের সময় লাগে, তিন দিনের মধ্যে সেটা সমাপ্ত হয়েছে। রিপোর্ট কালকে বিকেলে জমা দেওয়া হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা এরই মধ্যে আমরা হাতে পেয়েছি ।
তিনি আরও বলেন, এগুলো সব একসঙ্গে করে, কম্পাইল করে চার্জশিট প্রণয়নের কাজটা কাল রাতের মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। আজ আদালতে সেটা দাখিল করা হবে, হয়তো এরই মধ্যে হয়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আদালতের ছুটি থাকলেও এ মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ আদালতের ছুটি চিফ জাস্টিস বাতিল করার চিন্তা করছেন; এটা আইন মন্ত্রণালয় ডিল করছে।
তিনি বলেন, শুধু এই মামলাটি ডিল করার জন্য আমরা একজন স্পেশাল পিপি নিয়োগ করেছি। সবকিছু বিবেচনায় আমরা আশা করছি যে আজকের মধ্যেই চার্জশিট দেওয়া হবে এবং খুব সম্ভবত পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে এই বিচার সমাপ্ত হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় দ্রুত আসামিদের যাতে গ্রেফতার করা যায়, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, সরকার হিসেবে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা এবং বিচারের ব্যবস্থাটা নিশ্চিত করছি। আমরা সবচেয়ে মনোযোগ এখানেই দিয়েছি যে দ্রুততম সময়ে যাতে অভিযুক্ত বা অপরাধীরা গ্রেফতার হয়। সেই জায়গায় এই তিন মাসে প্রত্যেকটি ঘটনায় আমরা সফল হয়েছি। আর ভবিষ্যতেও আমরা এ ধরনের যেকোনো ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্ত বা অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বিএসআরএফ সভাপতি মাসউদুল হক। এতে উপস্থিত ছিলেন তথ্য অধিদফতরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে রুমের ভেতরে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। এক পর্যায়ে আসামির বাসার সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি।
ডাকাডাকির পর কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান।
ঘটনাস্থলে স্বপ্নাকে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায়, তার স্বামী রামিসাকে বাথরুমের ভেতরে আটকে রেখে ধর্ষণ করে এবং গলা কেটে হত্যা করে। রামিসার মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে তার মাথা কাটে। এছাড়া যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। এরপর জানালার গ্রিল কেটে সোহেল রানা পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় সোহেল রানা, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ও অজ্ঞাত আরও একজনকে আসামি করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর স্বপ্নাকে আটক করে পুলিশ।
সোহেল আত্মগোপনে চলে গেলেও সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, বুধবার (২০ মে) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন গ্রেপ্তার আসামি সোহেল রানা। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তবে অজ্ঞাত আসামি এখনও পলাতক রয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করে সোহেল। পরে তিনি শিশুটির গলা কেটে মরদেহ কয়েক টুকরো করেন।
শিশুটির চিৎকার শুনে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা দ্রুত সেখানে গেলেও তার আগেই সোহেল রামিসার মরদেহ বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখে। পরে টয়লেটের ভেতরে একটি বালতি থেকে মাথা উদ্ধার করা হয়।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে এরই মধ্যে শিশুটির মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বুধবার (২০ মে) রাত ৯টার দিকে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের ইছাপুরের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামে এশার নামাজ শেষে তার জানাজা সম্পন্ন হয়।