ময়মনসিংহের গৌরীপুরে আড়াই বছরের শিশু ওয়াসকুরুনিকে বিষ খাইয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি সৎ মা আকলিমা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের সঠিক রহস্য উদঘাটনের জন্য অপর আসামি শিশুটির বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ময়মনসিংহের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিনা আক্তার তমার আদালতে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন।
এই ঘটনায় মামলার অন্য আসামি শিশুটির বাবা আব্দুল কাদিরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের বিচারকের কাছে রিমান্ড আবেদন করেছেন বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গৌরীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম জানান।
এসআই রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওয়াসকুরুনি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দুই আসামিকে শুক্রবার আদালতে হাজির করা হয়। সৎ মা আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের সঠিক রহস্য উদঘাটনের জন্য শিশুটির বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। আগামী রোববার রিমান্ড আবেদনের শুনানি হবে।’
প্রসঙ্গত,এর আগে, গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর)গৌরীপুর উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের বীরপুর দত্তবাড়ি গ্রামে ওয়াসকুরুনিকে বিষ খাইয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় গত বুধবার শিশুটির মা মোছা. শেফালীর অভিযোগ দায়েরের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের বীরপুর দত্তবাড়ি গ্রামে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত সৎ মা আকলিমা ও বাবা আব্দুল কাদিরকে আটক করা হয়।
পরে ওইদিন রাতেই লিখিত অভিযোগটি থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হলে দুজনকে গ্রেফতার দেখিয়ে শুক্রবার আদালতে পাঠানো হয়।
স্থানীয় ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল কাদিরের বাড়ি উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের বীরপুর দত্তবাড়ি গ্রামে। ২০১৫ সালে আব্দুল কাদির উপজেলার মইলাকান্দা ইউনিয়নের বড় কালীহর গ্রামের আব্দুল হাকিমের মেয়ে মোছা. শেফালিকে বিয়ে করেন।
তাদের জয়নাল আবেদীন (৮) ও ওয়াসকুরুনি (আড়াই বছর) নামে দুই সন্তান রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে আইনিভাবে আব্দুল কাদিরের সঙ্গে শেফালীর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
বিচ্ছেদের এক সপ্তাহ পর আব্দুল কাদির বোকাইনগর ইউনিয়নের কাশিমপুর গ্রামের বাসিন্দা আকলিমাকে বিয়ে করেন। এরপর তিনি দুই সন্তান জয়নাল আবেদীন ও ওয়াসকুরুনি ও দ্বিতীয় স্ত্রী আকলিমাকে নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করতেন।
এদিকে, গত মঙ্গলবার দুপুরে আকলিমা শিশু ওয়াসকুরুনিকে ডিম খাওয়ায় ও পানি পান করায়। এরপর শিশুটিকে গোসল করিয়ে ঘুম পাড়াতে বিছানায় নিয়ে গেলে শিশুটি কাশতে শুরু করে। কাশির শব্দ শোনে ঘরে ছুটে এসে দাদী আছিয়া আক্তার শিশুটির মুখে বিষের গন্ধ পান।
পরিবারের লোকজন দ্রুত শিশুটিকে প্রথমে গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি মারা যায়।
পরবর্তীতে গত বুধবার নিহত ওয়াসকুরনির মা মোছা. শেফালী আক্তার বাদী হয়ে প্রাক্তন স্বামী আব্দুল কাদির ও তার স্ত্রী আকলিমার বিরুদ্ধে বিষ খাইয়ে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে মর্মে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরে বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের বীরপুর দত্তবাড়ি গ্রামে অভিযান চালিয়ে পুলিশ অভিযুক্ত কাদির ও আকলিমাকে আটক করে।
পরে ওইদিন রাতেই শিশুটির মা মোছা. শেফালীর লিখিত অভিযোগটি থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হলে আটক দু'জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে শুক্রবার আদালতে পাঠানো হয়।
শিশুর মা মোছা. শেফালী বলেন, ‘আকলিমার সঙ্গে পরকীয়ার কারণেই আমাকে তালাক দিয়ে আকলিমাকে বিয়ে করে আব্দুল কাদির। গত ৬ অক্টোবর আমার ছোট ছেলেকে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছে কাদির ও তার স্ত্রী আকলিমা। আমাকে না জানিয়ে সৎ মাকে আসল মা সাজিয়ে হাসপাতাল থেকে ছেলের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসে। আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নিহত শিশু ওয়াসকুরুনির মায়ের অভিযোগ পাওয়ার পরই পুলিশ অভিযুক্ত সৎ মা ও বাবা আব্দুল কাদিরকে গ্রেফতার করেছে। শুক্রবার তাদের দু'জনকে আদালতে পাঠানো হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সৎ মা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আব্দুল কাদিরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে সৎ মা ও বাবা কাদিরকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।’