২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা যুবক আমির হোসেনকে গুলি এবং নাদিম ও মায়া ইসলাম নামে আরও দুজনকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একই মামলায় রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রোববার (২৬ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্যরা হলেন— বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এদিন বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে রায়ের বিবরণী পড়া শুরু হয়। কার্যক্রমের শুরুতেই রায়ের বিবরণ সরাসরি সম্প্রচারের জন্য আদালতের অনুমতি চান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি সাপেক্ষেই পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) এই ঐতিহাসিক রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
রায়ের শুরুতেই আসামিদের অপরাধের দায় পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার। এরপর মামলার আনুষ্ঠানিক চার্জ (অভিযোগ) পড়ে শোনান বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। সর্বশেষ মূল রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে কড়া নিরাপত্তায় আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ মামলার অপর চার আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
মৃত্যৃদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- হাবিবুর রহমান (সাবেক ডিএমপি কমিশনার), মো. রাশেদুল ইসলাম (সাবেক এডিসি, খিলগাঁও জোন) এবং মো. মশিউর রহমান (সাবেক ওসি, রামপুরা থানা)।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন- তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া (সাবেক এসআই, রামপুরা থানা)।
২০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন- চঞ্চল চন্দ্র সরকার (তৎকালীন এএসআই, রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ি)।
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, রায়ে আমরা সন্তোষ প্রকাশ করছি। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারে অতি উৎসাহী ছিলেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিব। তিনি ওয়্যারলেসে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তার নির্দেশে পুলিশ কর্মকর্তারা হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ১৯ জুলাই বিকেলে রামপুরায় কফিশপ থেকে কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন আমির হোসেন। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের দুই পাশে পুলিশ-বিজিবির গাড়ি দেখে ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন চারতলা ভবনের ছাদে ওঠেন তিনি। ওই সময় পুলিশও তার পিছু পিছু যায়। একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে ওই নির্মাণাধীন ভবনটির ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন আমির। কিন্তু তাকে দেখে ফেলে পুলিশ। পরে তার ওপর ছয়টি গুলি ছোড়ে এক পুলিশ সদস্য। এতে তিন তলায় পড়ে গেলে তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন উদ্ধার করেন। এরপর বনশ্রীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওইদিন রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসকরা। সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরেন ভুক্তভোগী ওই তরুণ। এছাড়া একইদিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নিহত হন। একইসাথে মায়া ইসলামের ছয় বছর বয়সী নাতি বাসিত খান মুসা গুলিবিদ্ধ হয়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিলেও এখনও কথা বলতে পারছে না এই শিশু।
এ ঘটনায় ভুক্তভুগী পরিবারগুলো ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করে। ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি রাতে আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো সাবেক এএসআই চঞ্চল সরকারকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে গ্রেপ্তার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার নেতৃত্বাধীন ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি দল।
২০২৫ সালের ৭ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরের মাসে ১০ আগস্ট তিনটি অভিযোগ আমলে নিয়ে পাঁচজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ১ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২৫ আগস্ট পলাতক আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজিরের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। গত ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।
২৩ অক্টোবর প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন কার্নিশে ঝুলে থাকা গুলিবিদ্ধ হওয়া আমির হোসেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১।
ওইদিন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান। আসামিকে অভিযোগ পড়ে শোনান তিনি। এরপর নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন চঞ্চল। ১৬ সেপ্টেম্বর পলাতক চার আসামির পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।
এই তিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আজ ট্রাইব্যুনাল এ ঐতিহাসিক রায় দিলেন।