বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
স্বাস্থ্য-লাইফস্টাইল

বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্ক হান্টাভাইরাস, যেভাবে ছড়ায়

সম্প্রতি আটলান্টিক মহাসাগরে ক্রুজ শিপ 'এমভি হন্ডিয়াস' এ নতুন রোগ হ্যান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশ্বজুড়ে এক নতুন উদ্বেগের তৈরি করেছে। বিশেষ করে এই ভাইরাসে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ হয়। এই তথ্য মানুষের মনে কোভিডের মতো আরেকটি মহামারির আশঙ্কা তৈরি করেছে। 

কোভিড-১৯ এবং হ্যান্টাভাইরাসের সংক্রমণের ধরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোভিড-১৯ ছিল একটি অত্যন্ত সংক্রামক শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস। সাধারণ কথাবার্তা, হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাতাসে ড্রপলেটের আকারে ভেসে থাকে এবং খুব দ্রুত মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। 

অন্যদিকে, হ্যান্টাভাইরাস মূলত একটি জুনোটিক রোগ, যা প্রধানত ইঁদুর বা রোডেন্ট থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

সাধারণত মানুষ তখন আক্রান্ত হয়, যখন তারা ইঁদুরের মল, প্রস্রাব বা লালা দ্বারা দূষিত ধূলিকণা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করে। ক্রুজ শিপটিতে যে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে, তা হ্যান্টাভাইরাসের একটি বিশেষ স্ট্রেইন--'অ্যান্ডিস ভাইরাস'। 

এই স্ট্রেইন বিরল ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে সক্ষম। তবে এটি কোভিডের মতো সাধারণ নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। এর সংক্রমণের জন্য আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে অত্যন্ত দীর্ঘসময় ধরে এবং ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শের প্রয়োজন হয়, যা সাধারণত আবদ্ধ ও বদ্ধ কোনও পরিবেশেই সম্ভব।

সংক্রামক ব্যাধি বিজ্ঞানের ভাষায় সংক্রমণের চেইন বা ধারা বোঝার জন্য 'জেনারেলেশন' বা প্রজন্মের ধারণা ব্যবহৃত হয়। এমভি হন্ডিয়াসের ঘটনা বিশ্লেষণে গবেষকরা সংক্রমণের যে ধারা লক্ষ্য করেছেন, তা থেকেই এই 'জেনারেলেশন ৩'-এর বিষয়টি সামনে এসেছে।

১. জেনারেলেশন ১: সংক্রমণের উৎস অর্থাৎ বন্যপ্রাণী বা ইঁদুর থেকে সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তি।

২. জেনারেলেশন ২: আক্রান্ত ব্যক্তি যখন তার ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা অন্য কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে সংক্রমিত করেন।

৩. জেনারেলেশন ৩: যদি দ্বিতীয় ব্যক্তি থেকে তৃতীয় কোনও ব্যক্তি আক্রান্ত হন, তবে তাকে তৃতীয় প্রজন্মের সংক্রমণ বলা হয়।

মূলত ক্রুজ শিপের মতো বদ্ধ পরিবেশে যাত্রীরা দীর্ঘদিন একসাথে থাকায় এই সংক্রমণের চেইন তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ উন্মুক্ত পরিবেশে ঘটার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাহাজের এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং দুঃখজনকভাবে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। 
অনেক যাত্রী ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে। 

এই ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড বা লক্ষণ প্রকাশ পায় দীর্ঘ ৪২ দিন পর, তাই স্বাস্থ্য সতর্কতায় কোনও শিথিলতা নেই। তবে যেহেতু এটি বায়ুবাহিত নয়, তাই সাধারণ জনগণের মধ্যে এটি মহামারি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম।

যারা এমভি হন্ডিয়াস ক্রুজ শিপের ঘটনার সাথে যুক্ত ছিলেন, তাদের নির্দিষ্ট কোয়ারেন্টাইন ও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

যদি হঠাৎ জ্বর, ক্লান্তি, পেশিতে তীব্র ব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো ফ্লু-এর উপসর্গ দেখা দেয়, তবে বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

হ্যান্টাভাইরাস প্রতিরোধের প্রধান উপায় হলো ইঁদুর বা বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। বদ্ধ জায়গায় ইঁদুরের উপদ্রব থাকলে তা দ্রুত পরিষ্কার করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।

আতঙ্ক না ছড়িয়ে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সতর্ক থাকাই এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান দায়িত্ব। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার এই বিভ্রান্তি নিরসনের চেষ্টা করছেন। বিজ্ঞানের আলোকে স্পষ্ট যে, হ্যান্টাভাইরাস কোভিড-১৯-এর মতো বায়ুবাহিত (Airborne) নয় এবং এটি একইভাবে ছড়িয়ে পড়ার কোনও যৌক্তিক কারণ নেই। বরং এটি নির্দিষ্ট পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল একটি রোগ। সূত্র-জিনিউজ।

 

সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ