মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা।।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী হচ্ছে পুলিশ। একটি দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নাগরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরিবেশ অনেকাংশে নির্ভর করে পুলিশের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থার উপর। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অপব্যবহার, দলীয়করণ, গুম-খুন, বিরোধী মত দমন এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের মানুষের এক বড় অংশের মধ্যে পুলিশের প্রতি ভয়, অনাস্থা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের পুলিশ সপ্তাহ এমন এক বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনগণ একটি মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও গণমুখী পুলিশ বাহিনী প্রত্যাশা করছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে গঠিত সরকার প্রথমবারের মতো পুলিশ সপ্তাহ পালন করছে।
” আর কোনোও ফ্যাসিবাদ যেন পুলিশ কে দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাবহার করতে না পারে, পুলিশ সদস্যদের সেই শপথ নিতে হবে”, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ এ কথা বলেন।
ফলে এবারের পুলিশ সপ্তাহ শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। গত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার সময় পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে। অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তার পরিবর্তে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার, হামলা-মামলা ও ভয়ভীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। এ সময় বিডিআর বিদ্রোহ, শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডি, গুম, খুন, ক্রসফায়ার এবং শেয়ারবাজার লুটের মতো বহু ঘটনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও বিতর্ক জড়িয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই দীর্ঘ ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের উপর আক্রমণের ঘটনা প্রমাণ করে যে জনগণ ও পুলিশের সম্পর্ক ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়েছিল। অনেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা দেশত্যাগ করেন, আবার বহু সদস্য স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেন।
এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পুলিশের পোশাক পরিবর্তনসহ কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—শুধু পোশাক বদলালেই হবে না, বদলাতে হবে মানসিকতা, আচরণ ও প্রশাসনিক কাঠামো। জনগণের কাছে পুলিশকে “ভয়ের প্রতীক” নয়, “নিরাপত্তার প্রতীক” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
ঈদুল আজহা সামনে, বড় চ্যালেঞ্জ সড়ক ব্যবস্থাপনা সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা। প্রতি ঈদে দেশের মহাসড়কগুলোতে ভয়াবহ যানজট, চাঁদাবাজি, দুর্ঘটনা ও যাত্রী দুর্ভোগ বড় জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়। বিগত ঈদুল ফিতরে সরকারের সড়ক ব্যবস্থাপনা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। ফলে এবারের ঈদকে সামনে রেখে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রায় ৪ হাজার এএসআই (নিরস্ত্র) পদ শূন্য হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ২ হাজার বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বাকি ২ হাজার সরাসরি নিয়োগের চিন্তা চলছে। কিন্তু একই সময়ে কনস্টেবল থেকে এটিএসআই পদে উত্তীর্ণ ৫৫৯ জন সদস্য দীর্ঘদিন ধরে পদায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত সহকারী টাউন সাব-ইন্সপেক্টর (এটিএসআই) এবং টাউন সাব-ইন্সপেক্টর (টিএসআই) পদমর্যাদার সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি বৈষম্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে । অভিযোগ উঠেছে, বাহিনীর অন্যান্য পদে পদোন্নতির হার সন্তোষজনক বা শতভাগ হলেও, এই দুটি পদে পদোন্নতির হার অত্যন্ত নগণ্য । ২০২৪-২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নতুন ২০০০ হাজার এএসআই (নিঃ) শূন্য পদ সৃষ্টি সাপেক্ষে কনস্টেবল/নায়েক থেকে এএসআই (নিঃ) পদে শতভাগ ও নায়েক থেকে এএসআই (সঃ) পদে শতভাগসহ অন্যান্য পদ গুলিতেও প্রায় সন্তোষজনক পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে । অথচ একই সময়ে এটিএসআই পদে ৫৫৯ জন এবং টিএসআই পদে ৬০ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও তাদের কারোরই পদোন্নতি হয়নি । তথ্যমতে, মাত্র ১১ জন এটিএসআই এবং ৫ জন টিএসআই কর্মকর্তার জন্য ক্লিয়ারেন্স চাওয়া হয়েছে, যা মোট পদের তুলনায় অতি সামান্য ।
এই ৫৫৯ জনকে অবিলম্বে পদায়ন করা হলে সরকার একদিকে যেমন দ্রুত জনবল সংকট মোকাবিলা করতে পারবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় ও দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা থেকেও রেহাই পাবে। নতুন নিয়োগ সম্পন্ন করতে যেখানে ৪ থেকে ৫ মাস সময় লাগতে পারে, সেখানে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত এটিএসআইদের কাজে লাগানো হলে ঈদযাত্রায় তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া সম্ভব।
তারা দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং সড়কে চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সরকার চাইলে এটি একটি যুগান্তকারী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে।
সড়ক মন্ত্রণালয়ের সীমাবদ্ধতা ও সমন্বয় সংকট বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব। সড়ক, যোগাযোগ ও পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রায়ই তাদের হিমশিম খেতে হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি-র সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সড়ক পরিবহন মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে পুলিশ ও আনসার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় অনেক সময় সরাসরি জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বাস্তবতায় সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন সমন্বিত কাঠামো তৈরি সময়ের দাবি। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাফিক রেসপন্স ইউনিট, প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা এবং জেলা পর্যায়ে সমন্বিত কমান্ড সেল গঠন করা যেতে পারে।
পুলিশ সংস্কারে যে বিষয়গুলো জরুরি
১. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ প্রশাসন গঠন
২. নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
৩. মানবাধিকার ও নাগরিক আচরণ বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ
৪. ট্রাফিক ব্যবস্থায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ সদস্যদের দ্রুত পদায়ন
৫. চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
৬. প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করা
৭. জনগণের অভিযোগ গ্রহণে স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন
৮. কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা নতুন সরকারের সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ।
বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে বহু সরকার এসেছে-গেছে, কিন্তু জনগণের কাছে একটি সত্যিকারের গণমুখী, মানবিক ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার সুযোগ খুব কমই সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন। এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন করা।
পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ তাই শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; এটি হতে পারে নতুন বাংলাদেশ গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। জনগণ এখন এমন একটি পুলিশ বাহিনী চায়, যারা ক্ষমতাসীন দলের নয়—রাষ্ট্র ও জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে।
যদি সরকার সত্যিকার অর্থে পুলিশ সংস্কার, সড়ক শৃঙ্খলা, দুর্নীতি দমন এবং জনআস্থা পুনর্গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে সেটি শুধু আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করবে না, বরং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ভিতও আরও মজবুত করবে।
( লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি)