বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম
রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় আইএফআইসি ব্যাংকের এটিএম বুথের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন কনফিডেন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের আইপিও ব্যবস্থাপনায় ইউসিবি ইনভেস্টমেন্টের সঙ্গে চুক্তি নতুন সাবসিডিয়ারি কোম্পানি গঠনের সিদ্ধান্ত এসিআইয়ের Price Sensitive Information of Advanced Chemical Industries PLC জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বিকাশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ৬০ কর্মদিবসে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৩,০০৩ কোটি টাকার নতুন আমানত সংগ্রহ সূচকের উত্থানে লেনদেন শেষ দেশীয় ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন প্রস্তুতকারকদের সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর যশোরে এমপি গোলাম রসুলের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ফেসবুকে নতুন রেকর্ড - সাকিবকে পেছনে ফেলে শীর্ষে পরীমণি
advertisement
আইন-আদালত

২৬ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক

তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে তদন্তের নির্দেশ

দেশের বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র‍্যান্ডের ২৬টি টুথপেস্টে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার ঘটনায় তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে দিয়েছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এই বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন।

আইনজীবী জানান, প্রাথমিক এই তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হবে। তদন্তে যদি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে জনস্বার্থে এসব ক্ষতিকর পণ্য অবিলম্বে বাজার থেকে প্রত্যাহারের জোর আবেদন জানানো হবে।

গবেষণা প্রতিবেদন ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়াবহতা
এর আগে, গত রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশব্যাপী দীর্ঘ এক বছর এই সমন্বিত গবেষণাটি পরিচালিত হয়। বাস্তব পরিস্থিতি ও নীতিগত চ্যালেঞ্জগুলো গভীরভাবে মূল্যায়নের জন্য এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল ব্যাপকভিত্তিক ভোক্তা জরিপ, আধুনিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক ও বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট সাক্ষাৎকার।

বর্তমান বিশ্বে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বিভিন্ন উন্নত দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এই ধরনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও গবেষণা এই প্রথম। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গবেষণাটি ভবিষ্যতে দেশের বাজারে নিরাপদ টুথপেস্ট নিশ্চিতকরণে সঠিক মানদণ্ড নির্ধারণ, কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

গবেষণার পদ্ধতি ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল
টুথপেস্ট ব্যবহারের সাধারণ অভ্যাস এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতার মাত্রা জানতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুই হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর একটি বিস্তারিত জরিপ চালানো হয়।

এর পাশাপাশি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই)’ ল্যাবরেটরিতে আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি— স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি এবং ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করে ১৯টি ব্র্যান্ডের মোট ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক উপস্থিত রয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৭৬ শতাংশ টুথপেস্টে এই কৃত্রিম পলিমার কণার সন্ধান মিলেছে। বাকি ৮টি নমুনায় কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ন্যূনতম ২০টি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

দেশি ও আমদানিকৃত উভয় পণ্যের চিত্র এবং শিশু সুরক্ষায় উদ্বেগ
পরীক্ষা করা টুথপেস্টগুলো মূলত বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম— এই চারটি দেশ থেকে উৎপাদিত হয়ে বাজারে এসেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই চারটি দেশের উৎপাদিত টুথপেস্টেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ: দেশি ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।

ভারত: আমদানিকৃত ৫টি নমুনার মধ্যে ১টিতে এর অস্তিত্ব মিলেছে।

থাইল্যান্ড: সংগৃহীত ২টি নমুনার মধ্যে ১টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

ভিয়েতনাম: ভিয়েতনামের ২টি নমুনার দুটিতেই (শতভাগ) মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।

এগুলোর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে সর্বোচ্চ ৩২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, কোমলমতি শিশুদের ব্যবহারের জন্য বাজারে প্রচলিত ৬টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে তার মধ্যে ৪টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব শিশুতোষ টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। বাকি ২টি শিশুতোষ নমুনায় কোনো ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যায়নি।

কোন ব্র্যান্ডে কত প্লাস্টিক কণা?
প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ তুলে ধরে প্রতিবেদনে জানানো হয়:

মেডিপ্লাস ফ্লুরিড জেল: ৩২০টি (সবচেয়ে বেশি)

ক্লোজ আপ রেড হট: ১৬০টি

ক্লোজ আপ মেন্থল ফ্রেশ: ১৬০টি

কুডুমু আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলা স্ট্রবেরি: ১৪০টি

সিগন্যাল গ্রিন টি: ১২০টি

পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট: ১০০টি

হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ার: ১০০টি

সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্ট: ৮০টি

শিশুদের টুথপেস্টে ক্ষতিকর কণা
শিশুদের সুরক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করে বাজারে থাকা শিশুদের বিশেষ টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উদ্বেগজনক। এর মধ্যে রয়েছে:

কুডুমু আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলা (স্ট্রবেরি): ১৪০টি

মেরিল বেবি (স্ট্রবেরি): ৬০টি

মেরিল বেবি (অরেঞ্জ): ৪০টি

পেপসোডেন্ট কিড (অরেঞ্জ): ২০টি

মোড়কে তথ্যের অনুপস্থিতি ও আইনি পদক্ষেপ
গবেষণায় আরও একটি গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়ক, গায়ে সাঁটানো লেবেল বা উপাদানের তালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক বা কৃত্রিম পলিমার ব্যবহারের কোনো তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না।

ফলস্বরূপ, সাধারণ ভোক্তারা প্রতিদিন অজান্তেই ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করলেও তা জানার কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে, সঠিক তথ্যের অভাবে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষেও এসব পণ্যের ওপর কার্যকর নজরদারি চালানো বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

হাইকোর্টের এই সময়োপযোগী নির্দেশ ও বিশেষজ্ঞ কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশের টুথপেস্টের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 

সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ