পণ্য ও সেবা উভয় খাতের রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রত্যাশা নিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মোট রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে সরকার।
রোববার (২৬ জুলাই) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মোট রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আসবে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি খাত থেকে। এ ছাড়া বাকি ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সেবা খাত রপ্তানি থেকে অর্জনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে গত অর্থবছরের রপ্তানি খাতের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে জানান যে, বিগত অর্থবছরে দেশ কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বৈশ্বিক নানা কারণে এ খাতের প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর ছিল। তবে বর্তমান নবনির্বাচিত সরকারের কার্যকর নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় বাজেটে ঘোষিত বিভিন্ন ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপের ফলে চলতি অর্থবছরে দেশের রপ্তানি খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াবে এবং হারানো গতি ফিরে পাবে বলে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও অগ্রাধিকার খাতসমূহসংবাদ সম্মেলনে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই এককভাবে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য পুরোপুরি অনুকূল নয়।
এই একক খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে— চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পুনর্ব্যবহার (শিপ রিসাইক্লিং), লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, এবং তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি (IT) খাতকে রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে বাণিজ্য চুক্তির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএইচ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সংক্রান্ত আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও চার থেকে পাঁচটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
জাপানের সঙ্গে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করার জন্য এটি আগামী সংসদ অধিবেশনে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি, ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানান মন্ত্রী।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়া নিয়ে অতীতে যে শঙ্কা বা অনিশ্চয়তা ছিল, তা এখন অনেকটাই কেটে গেছে বলে আশ্বস্ত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এর ফলে দেশের রপ্তানিকারকরা আগামী তিন বছর পর্যন্ত বর্তমানের মতো আন্তর্জাতিক বাজার সুবিধা ও জিএসপি সুবিধা ভোগ অব্যাহত রাখতে পারবেন।
অন্যদিকে, রপ্তানি খাতের অন্যতম প্রধান অন্তরায় বা চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত জ্বালানি সংকট সমাধানেও কাজ করছে সরকার। শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং এলএনজি আমদানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতিরিক্ত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
সংবাদ শেয়ষে বাণিজ্যমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক নানা উত্তেজনা সত্ত্বেও উন্নত ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, বাণিজ্য চুক্তির পরিসর বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে সরকার নির্ধারিত রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে অর্জন করতে সক্ষম হবে।