বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম
ঢাকায় ভুটানের রাজার যাত্রাবিরতি, সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন রাষ্ট্রপতি মালয়েশিয়ায় বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী পাঠাবে সরকার Price Sensitive Information of Mutual Trust Bank PLC আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মহানবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়েছেন, কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি : আইনমন্ত্রী বাংলাদেশের সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে চায় ইউএনডিপি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাদক মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেপ্তার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফল জালিয়াতির মামলায় পুলিশের চার্জশিটে বড় গরমিল ঢাকায় আইএফআইসি ব্যাংকের আরও ২টি এটিএম বুথের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
advertisement
নির্বাচিত কলাম

আশ্বাসের তিস্তা ও বাস্তবতার খরা: একটি টেকসই সমাধানের খোঁজে

তাসনিমা ইসলাম অবনী ।।

নদী শুধু একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, এটি সভ্যতার ধমনী। বাংলাদেশের উত্তর জনপদের এই ধমনীর নাম 'তিস্তা'। গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং পরিবেশগত আলোচনায় তিস্তা একটি বহুল আলোচিত নাম। সম্প্রতি তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং এর অর্থায়নকে ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক আলোচনা নতুন মোড় নিয়েছে। চীন নাকি ভারত-কে করবে তিস্তা প্রকল্পের উন্নয়ন, এই আলোচনা এখন চায়ের কাপ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকদের টেবিল পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু এই বড় বড় ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ভিড়ে চাপা পড়ে যাচ্ছে নদীপাড়ের লাখো মানুষের কান্না আর প্রকৃতির আর্তনাদ।

তিস্তা নদীকে ঘিরে বর্তমান আলোচনা মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি হচ্ছে অববাহিকাভিত্তিক পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, আর অন্যটি হচ্ছে নদীর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়ন। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সাথে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকায় বাংলাদেশ এখন নিজস্ব সীমান্তে নদীটির রূপরেখা পরিবর্তনের কথা ভাবছে। 'তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট' বা 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা' তারই একটি অংশ।

এটি মূলত ১২ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রজেক্ট। এর মূল লক্ষ্য হলো তিস্তা নদীকে এমন ভাবে পুনর্গঠন করা যাতে ভারতের পানির উপর আমাদের নির্ভরতা অনেকটাই কমে যায়। প্রথমে নদী খনন বা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে তিস্তা নদীর প্রায় ১২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গভীরতা বাড়ানো হবে। এতে নদী অনেক বেশি পানি ধরে রাখতে পারবে ফলে বর্ষাকালে হুট করে বন্যা হবে না। এরপর নদী শাসনের মাধ্যমে তিস্তার দুই তীরে ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও শক্তিশালী গাইড বাঁধ দেওয়া হবে ফলে নদী ভাঙ্গন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর নদীকে একটি নির্দিষ্ট সীমানায় এনে প্রায় ১৭১ বর্গ কিলোমিটার জমি উদ্ধার করা হবে। আর শেষে এই উদ্ধারকৃত জমিতে তৈরি হবে আধুনিক স্যাটেলাইট টাউন, ফাইভ স্টার হোটেল, রিসোর্ট এবং বিনোদন কেন্দ্র। এছাড়া থাকবে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল সৌর বিদ্যুৎ প্ল্যাট এবং কলকারখানা।

ভাবা যায়! যে তিস্তা নদী এখন উত্তরবঙ্গের মানুষের দুঃখ, এই প্রজেক্ট সফল হলে এই তিস্তাই হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পানি ছাড়া শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে কি একটি নদীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব?

উত্তরবঙ্গের প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তিস্তার ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে যখন তিস্তা মরুভূমিতে পরিণত হয়, তখন কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায় এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। আবার বর্ষাকালে যখন ভারত একতরফাভাবে গজলডোবা ব্যারেজের কপাট খুলে দেয়, তখন আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত হয় মাইলের পর মাইল ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি। অর্থাৎ, তিস্তা এখন আমাদের জন্য শুষ্ক মৌসুমে খরা আর বর্ষায় বন্যার এক নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যেকোনো মহাপরিকল্পনা নেওয়ার আগে আমাদের মূল সংকটের দিকে নজর দিতে হবে-তা হলো পানির প্রাপ্যতা।

সাম্প্রতিক সময়ে তিস্তা নিয়ে আলোচনাকে উসকে দিয়েছে এর অর্থায়নের বিষয়টি। চীন এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী এবং চীনের 'পাওয়ার চায়না' কোম্পানি প্রায় ৩ বছর ধরে বাংলাদেশে সমীক্ষাও চালায়। অন্যদিকে, ভারতের পক্ষ থেকেও তিস্তা প্রকল্পের উন্নয়নে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কারণ তিস্তা নদীর অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেনস নেকের খুব কাছে। এই চিকেনস নেক হলো ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে তার সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলকে যুক্ত করার একমাত্র পথ। ভারতের আশঙ্কা, চীন যদি তিস্তা প্রজেক্টের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে এসে বছরের পর বছর কাজ করে, তবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থান। ভারতের সাথে আমাদের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক যেমন গভীর, তেমনি চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতাও আমাদের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ত্রিমুখী সমীকরণে বাংলাদেশের স্বার্থ যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের কূটনীতির মূল লক্ষ্য।

একটি উপ-সম্পাদকীয় পাতায় দাঁড়িয়ে আমাদের স্পষ্ট করে বলা দরকার, তিস্তা কোনো ভূ-রাজনৈতিক তাস নয়। এটি বাংলাদেশ ও ভারত-উভয় দেশের মানুষের জীবনযাত্রার সাথে জড়িত। ভারতের সাথে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দ্রুত সম্পাদন করা বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ উজানের পানি না পেলে নদীর নাব্যতা ধরে রাখা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা অসম্ভব। আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে 'আপার রাইপারিয়ান' বা উজানের দেশের যেমন অধিকার থাকে, তেমনি 'লোয়ার রাইপারিয়ান' বা ভাটির দেশেরও পানির ওপর প্রাকৃতিক অধিকার রয়েছে। হেলসিঙ্কি নিয়মাবলী বা আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী, অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারে সমতা ও ন্যায্যতার নীতি বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।

আমাদের এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ নিশ্চিত করে। যদি ভারত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে তাদের কেবল বাঁধ নির্মাণ বা নদী খনন করলেই হবে না; শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ থাকার নিশ্চয়তাও দিতে হবে। উজানে পানি আটকে রেখে ভাটিতে বাঁধ বা খাল খনন করলে কৃষকের কোনো লাভ হবে না। অন্যদিকে, চীনের প্রস্তাব যদি আমাদের শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করতে হয়, তবে প্রতিবেশী ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলোকেও কূটনৈতিকভাবে প্রশমিত করার দক্ষতা আমাদের দেখাতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণ যেন কোনোভাবেই দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝায় পরিণত না হয়, সেদিকেও তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আক্ষরিক অর্থেই তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। এটি নিয়ে আর কালক্ষেপণের সুযোগ আমাদের নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে আমাদের একটি বিশাল অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। তাই ভারত বা চীন-যে দেশই এই প্রকল্পে যুক্ত হোক না কেন, চূড়ান্ত শর্ত হতে হবে বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ জাতীয় স্বার্থ এবং স্বচ্ছতা। সরকারের উচিত জাতীয় ঐকমত্য, স্বচ্ছ আলোচনা এবং অত্যন্ত দক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে দ্রুত এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া। ভূরাজনীতির এই জটিল সমীকরণের সফল সমাধানে তিস্তায় আবারও প্রাণ

ফিরে আসুক এবং উত্তরের মানুষের মুখে হাসি ফুটুক-এটাই আজ সমগ্র জাতির একান্ত প্রত্যাশা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ