Home জানা-অজানা/প্রশিক্ষন ও পাঠশালা রোজার প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস

রোজার প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস

রোজার
Corporate Sangbad Sub Editor

Published: 15:24:33
54
0

image_pdfimage_print

মাহমুদ:
চলছে রোজার মাস, সিয়াম সাধনার মাস। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন এ রোজা বোধ হয় শেষনবীর সময় থেকেই শুরু হয়েছে। বিষয়টি কিন্তু তা না। রোজা শুরু হয়েছে আদি পিতা হজরত আদম আ. এর সময় থেকে। যেটি পর্যায়ক্রমে প্রায় সকল নবী রাসুল সা. গণের সময় তা অব্যাহত ছিল। তবে সর্বশেষ রোজার বিধান ফরজ করা হয় সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা. এর সময়। শেষনবী সা. এর ন্যায় অন্যান্য নবী-রাসুলগণের সময়ও রোজা ফরজ করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা খোদাভীতি অর্জন করতে পারো।’(সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৮৩)।

হজরত আদম আ. থেকে হজরত নূহ আ. পর্যন্ত রোজা:
হজরত নূহ আ. কে বলা হয় ‘দ্বিতীয় আদম’। তাঁর যুগেও সিয়াম পালন করা হয়েছিল। হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত নূহ (আ.) পর্যন্ত চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ ‘আইয়ামে বিয’এর রোজা ফরজ ছিল। সূত্র: তাফসিরে ইবনে কাসির।

হজরত ইব্রাহিম আ. এর সময়ে রোজা:
মুসলিম মিল্লাতের পিতা সহিফাপ্রাপ্ত নবী হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর যুগে ৩০টি সিয়াম ছিল বলে কেউ কেউ লিখেছেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পর আসমানি কিতাব ‘তাওরাত’প্রাপ্ত প্রসিদ্ধ নবী হজরত মুসা (আ.)-এর যুগেও সিয়াম ছিল। ইহুদিদের ওপর প্রতি শনিবার বছরের মধ্যে মহররমের ১০ তারিখে আশুরার দিন এবং অন্যান্য সময় রোজা ফরজ ছিল।

হজরত মুসা আ. এর সময় রোজা:
হজরত মুসা আ. ও ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। তুর পাহাড়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাঁকে আরো অতিরিক্ত ১০টি রোজা রাখার আদেশ দেন। ফলে তাঁর রোজা হয়েছিল মোট ৪০ দিন।

হজরত দাউদ আ. এর সময়ে রোজা:
আসমানি কিতাব ‘যবুর’প্রাপ্ত নবী হজরত দাউদ আ. এর যুগেও রোজার প্রচলন ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা হজরত দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি এক দিন পর পর রোজা রাখতেন। অর্থাৎ হজরত দাউদ আ. অর্ধেক বছর রোজা রাখতেন এবং অর্ধেক বছর বিনা রোজা থাকতেন। (বুখারি ও মুসলিম)

হজরত ঈসা আ. এর সময়ে রোজা:
আসমানি কিতাব ‘ইঞ্জিল’প্রাপ্ত বিশিষ্ট নবী হজরত ঈসা (আ.)-এর যুগে রোজার প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারী সম্প্রদায় রোজা রাখতেন। হজরত ঈসা (আ.) তাঁর ধর্ম প্রচার শুরুতে ইঞ্জিল পাওয়ার আগে জঙ্গলে ৪০ দিন সিয়াম সাধনা করেছিলেন। একদা হজরত ঈসা আ.কে তাঁর অনুসারীরা জিজ্ঞেস করেন যে, ‘আমরা অপবিত্র আত্মাকে কী করে বের করব?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘তা দোয়া ও রোজা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে বের হতে পারে না।’ (মথি ৭-৬৬, সিরাতুন নবী, ৫ম খণ্ড, পৃ. ২৮৭-২৮৮)।

হজরত ইদ্রিস আ. এর রোজা:
হজরত ইদ্রিস আ. এর রোজা সারা জীবন রোজা রেখেছিলেন।

হজরত মোহাম্মদ সা. এর সময়ের রোজা:
ইসলামের সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা. এর নবুওয়াত লাভের আগে আরবের মুশরিকদের মধ্যেও সিয়ামের প্রচলন ছিল। যেমন আশুরার দিনে কুরাইশরা জাহেলি যুগে রোজা রাখত এবং রাসুলুল্লাহ সা. জাহেলি যুগে ওই রোজা রাখতেন। এরপর যখন তিনি মদিনায় আগমন করেন তখন ওই রোজা নিজে রাখেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে রোজা রাখার হুকুম দেন।

পরবর্তীতে হিজরী দ্বিতীয় সালে উম্মতে মুহাম্মদির ওপর মাহে রমজানের রোজা ফরজ হলে তিনি আশুরার রোজা ছেড়ে দেন। (বুখারি ও মুসলিম)। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। পরে দ্বিতীয় হিজরি সালে তা রহিত হয়ে যায়।

খ্রিষ্টানদের রোজা:
খ্রিষ্টানদের জন্য রোজা পালনের বিধান ছিল। খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ফেরাউনের নীল নদে নিমজ্জিত হওয়ার দিন রোজা রাখত। পরে এর সঙ্গে সংযোগ করতে করতে রোজার সংখ্যা পঞ্চাশে গিয়ে পৌঁছে। পবিত্র বাইবেলে রোজাব্রত পালনের মাধ্যমেই আত্মশুদ্ধি ও কঠোর সংযম সাধনার সন্ধান পাওয়া যায়।

হিন্দুদের রোজা (উপবাস):
বিভিন্ন জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবার মধ্যেই রোজা পালনের ইতিহাস পাওয়া যায়। বেদের অনুসারী ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত অর্থাৎ উপবাস ছিল। প্রত্যেক হিন্দি মাসের ১১ তারিখে ব্রাহ্মণদের ওপর ‘একাদশীর’ উপবাস রয়েছে। এ হিসাবে তাদের উপবাস ২৪টি হয়। কোনো কোনো ব্রাহ্মণ কার্তিক মাসে প্রত্যেক সোমবার উপবাস করেন। কখনো হিন্দু যোগীরা ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করে চল্লিশে ব্রত পালন করেন।

চীনা সম্প্রদায়ের রোজা:
প্রাচীন চীনা সম্প্রদায়ের লোকেরা একাধারে কয়েক সপ্তাহ রোজা পালন করত এবং খ্রিষ্টান পাদরিদের ও পারসিক অগ্নিপূজকদের এবং হিন্দু যোগী ইত্যাকার ধর্মাবলম্ব্বীদের মধ্যে রোজার বিধান ছিল। পারসিক ও হিন্দু যোগীদের রোজার ধরন ছিল এরূপ, তারা রোজা থাকা অবস্থায় মাছ-মাংস, সবজি, তরকারি ইত্যাদি ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকত বটে; কিন্তু ফল-মূল এবং সামান্য পানীয় গ্রহণ করত।

এ ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রোজা পালনের ধারা অব্যাহত ছিল। মানবশুদ্ধির জন্য আদিম যুগ থেকেই অনেক গোত্র, বর্ণ, সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে রোজা প্রচলিত ছিল। যদিও ধরন ও প্রক্রিয়াগতভাবে এতে কেবল সংখ্যা, নিয়মকানুন ও সময়ের ব্যবধান কিছুটা ভিন্নতর ছিল।

আরও পড়তে পারেন: ইমাম তিরমিযী রহ. এর জীবনের অজানা কাহিনী

Print Friendly, PDF & Email

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.