Home bd news সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতার শঙ্কা

সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতার শঙ্কা

jatio sanchi patro
Senior Staff Reporter (SM)

Published: 11:42:42
35
0

image_pdfimage_print
ডেস্ক রিপোর্ট: চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। এ সময়ে সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয়েছে ২৩ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। উচ্চ সুদে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিয়ে কম সুদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেছে। বেশি সুদের কারণে সাধারণ মানুষও ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বিনিয়োগ করেছে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে। ফলে ব্যাংকে আমানত কমে যাচ্ছে। বিষয়টি সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় ক্রমেই ভারসাম্যহীনতার শঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করে খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ই। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এমন বিষয় উঠে এসেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠিত বৈঠকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার মূলনীতি হচ্ছে কম ব্যয় ও কম ঝুঁকি। কিন্তু সরকার জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে অস্বাভাবিক হারে ঋণ নিচ্ছে। এতে সরকারের সুদ ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ফলে সরকারের ঋণ ব্যবস্থপনার মূলনীতি মানা হচ্ছে না, যা দীর্ঘ মেয়াদে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে। এতে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই সভায় উঠে আসে। বিশেষজ্ঞরাও এ বিষয়ে সরকারের নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই সভায় যে পর্যবেক্ষণ এসেছে তার পুরোটাই সঠিক। সরকারের এ খাত থেকে ঋণ নেওয়ার কোনো দরকারই ছিল না। বিষয়টি এখনই অ্যাড্রেস (সমাধান) করা দরকার। দ্রুতই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়ে দিতে হবে, যা সরকার এর আগে একবার বলেছিল।অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভার ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এতে ট্রেজারি সিকিউরিটিজের সেকেন্ডারি মার্কেটের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক আর্থিক খাতের ওপর পড়ছে।
সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস হিসেবে ব্যাংক খাত ও ব্যাংকবহির্ভূত খাতের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ঋণ নেয়। ব্যাংক খাত থেকে দুই দশমিক ৪৯ থেকে সাড়ে আট টাকা শতাংশ পর্যন্ত সুুদে ঋণ নিতে পারে সরকার। অপরদিকে জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিতে হয় ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদ দিয়ে। আগে এই হার ছিল সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ পর্যন্ত। এখনও ব্যাংকের চেয়ে প্রায় পাঁচ শতাংশ বেশি সুদে জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিচ্ছে সরকার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রতিবন্ধী, পেনশনারসহ পিছিয়ে পড়া মানুষদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছুটা সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে বেশি সুদ দেওয়া হয়। কিন্তু এখন অনেক উচ্চবিত্তও এর সুযোগ নিচ্ছে। ফলে যাদের জন্য এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, তারা অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার বিষয়ে এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী কথা বলেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে।
জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৬০ হাজার ১২৫ কোটি টাকার। এই সময়ে সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৭৩৩ কোটি ও মেয়াদপূর্তিতে আসল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে আট হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে গত ৯ মাসে নিট বিক্রি হয়েছে ৩৬ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। অথচ জাতীয় বাজেটে চলতি অর্থবছরের পুরো সময়ে এ খাত থেকে সরকারের সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। ৯ মাসেই ছয় হাজার ৫৫৯ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২২ শতাংশ বেশি।

অথচ চলতি অর্থবছরে (২০১৭-১৮) জাতীয় বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৬০ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা ঋণ নেবে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ২৮ হাজার ২০৩ কোটি ও ব্যাংকবহির্ভূত খাত (সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য) থেকে ৩২ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা নেওয়ার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, ব্যাংক ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের চেয়ে সুদ হার বেশি হওয়ায় মানুষ জাতীয় সঞ্চয়পত্র বেশি ক্রয় করেছে। সঞ্চয়পত্র থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কম সুদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করছে।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া পর্যবেক্ষণ বলছে, জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ দিয়ে খাদ্য আমদানি ও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে আগাম অর্থ দেওয়া হয়েছে। যদি প্রবাহ ঠিক থাকত তাহলে জনগণের হাত ঘুরে টাকা ব্যাংকেই যেত। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের সঞ্চয়পত্র থেকে অস্বাভাবিকহারে ঋণ নেওয়া অর্থনীতিতে এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। ঋণ নিলেও উৎপাদনশীল কোনো খাতে এ অর্থ যায়নি। অনুৎপাদনশীল খাতে এ বিশাল পরিমাণ অর্থ যাওয়ায় টাকার হাতবদল বেশি হয়নি। এতে টাকার প্রবাহ কমে গেছে। সরকার যদি উৎপাদনশীল খাতে এ টাকা ব্যয় করত, তাহলেও অর্থনীতি লাভবান হতো।

Print Friendly, PDF & Email