Home ধর্ম ও জীবন হযরত খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রঃ) এর জীবনের অজানা কাহিনী

    হযরত খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রঃ) এর জীবনের অজানা কাহিনী

    হযরত খাজা মইনুদ্দীন চিশ্তী (রঃ)
    Corporate Sangbad Sub Editor

    Published: 16:29:08
    535
    0

    image_pdfimage_print
    মাহমুদুন্নবী: আখেরী নবী হযরত মোহাম্মদ মুস্তফা আহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে শান্তির ধর্ম ইসলাম আবির্ভাবের পর হতে বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব যেন অর্পিত হয় আধ্যাতিক সাধক, পীর, আউলিয়া, কামেলদের উপর। এছাড়া অধিকাংশ অমুসলিম এলাকায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এসকল আধ্যাত্বিক মানবদের ত্যাগের বিনিময়ে। নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া ইসলাম প্রচার পেয়েছে খুব অল্প স্থানেই। তবে দমন করা যায়নি ইসলাম প্রচার। যুদ্ধ করে দেশ জয় করা গেছে হয়তো, কিন্তু ইসলাম এসেছে এসব আধ্যাতিক সাধকদের হাত ধরেই। আল্লাহর দয়া আর সাহায্যে যেখানেই আস্তানা গড়েছেন এসকল কামেল বুজুর্গ পুরুষ, সেখানেই দলে দলে অমুসলিমরা এসেছে শান্তির ধর্ম ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। তবে এজন্য কম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি তাঁদের। এমনি এক ব্যক্তি শরীয়তের স্তম্ভ, তরীকতের নিদর্শন, মা’রেফতের জ্বলন্ত শিক্ষা, হাকীকতের আয়না হযরত খাজা মইনুদ্দীন হাসান চিশতী (রাঃ)।

    সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
    হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন পারশ্যে গোলযোগপূর্ণ নগর সঞ্জবের অন্তর্গত সিস্তান নামক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত সৈয়দ গিয়াসুদ্দীন হাসান সন্্জরী, মাতা সৈয়দা উম্মুল ওয়ারা। শৈশব ও বাল্যকাল তিনি এ গ্রামেই অতিবাহিত করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এতিম হন মইনুদ্দিন। প্রথমে মারা যান পিতা পরে মাতা। মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে আঙ্গুর বাগানসহ বেশ সম্পত্তির মালিক হন তিনি।

    একদিন খাজা ইব্রাহিম কান্দুযি (রঃ) মুঈনুদ্দীনের খেজুর বাগানে প্রবেশ করলেন। তিনি ইব্রাহিমের প্রতি আন্তরিক ভক্তি শ্রদ্ধা নিবেদন করার পর একগুচ্ছ তাজা আঙ্গুর তাঁর খেদমতে পেশ করেন। হযরত খাজা ইব্রাহিম অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে আঙ্গুর ভক্ষণ করেন এবং দীর্ঘ সময় আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে দোয়া করেন। অত:পর নিজ ব্যাগ হতে এক টুকরো রুটি চিবিয়ে খাজা মইনুদ্দিনকে খেতে দেন। রুটি খাওয়ার পর পরই তাঁর অর্ন্তদৃষ্টি খুলে যায় এবং দুনিয়ার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন।

    এরপর তিনি সমস্ত সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় দান করে সত্যের সন্ধানে স্বীয় জন্মভূমি ত্যাগ করে বোখারায় চলে যান। সে সময় বোখারা ছিল জ্ঞানার্জনের কেন্দ্রস্থল। ৫৪৪ হিজরী থেকে ৫৫০ হিজরী পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কোরান শরীফ মুখস্ত করেন এবং জাহেরী বিদ্যায় বুৎপত্তি লাভ করেন। এছাড়া তিনি ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের পর উচ্চ শিক্ষার জন্য ইরাকের নিশাপুরে গমন করেন। এই নিশাপুরের অদূরে হারূন নামক স্থানে তখনকার প্রখ্যাত কামেল বুজুর্গ হযরত খাজা ওসমান হারুনী কুদ্দেসা ছিররুহুল বারী (রহঃ) বাস করতেন। হযরত মুঈনুদ্দীন এই কামেল বুজুর্গের হাতে বায়াত গ্রহণ করেন এবং আড়াই বছর স্বীয় পীরের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন।

    এই সময়ে তিনি ১২টির বেশী দেশ তাঁর মুর্শেদের সাথে ভ্রমণ করেন। প্রতিটি ভ্রমণই ছিল পায়ে হেঁটে এবং প্রত্যেক ভ্রমণের সময় স্বীয় মূর্শেদের প্রয়োজনীয় মালপত্র স্বীয় মস্তকে বহন করতেন। ওসমান হারুনী (রহঃ) এর নিকট খেলাফত ও খিরকা লাভ করে তিনি সেখান থেকে বিদায় গ্রহণ করেন চলে যান খোরাসানে। খোরাসনে কিছুদিন অবস্থানের পর রওয়ানা দিলেন ইরাকের দিকে। তখন হিজরী ৫৫০ সাল। বাগদানে এসে সাক্ষাত পান হজরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর। হযরত বড়পীর (রহঃ) যথার্থই চিনলেন হযরত মইনুদ্দিনকে। তাঁর সম্পর্কে এরশাদ করলেন “এই ব্যক্তি তাঁর সময়ে শ্রেষ্ঠ আউলিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। অসংখ্য মানুষ উপকৃত হবেন তাঁর মাধ্যমে।” অনেক দিন সেখানে অবস্থানের পর বিদায় বেলায় বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) নির্দেশ প্রদান করেন, হে মইনুদ্দিন তুমি হিন্দুস্থান সফর করবে। পথে পথে দিন কাটে মইনুদ্দিনের আর রাত কাটে কবরস্থানে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে মইনুদ্দিনের সুখ্যাতি। যেখানেই যান প্রচন্ড ভীড় জমে যায় মানুষের।

    হিজরী ৫৮৩ সালে হযরত খাজা মইনুদ্দিন পবিত্র হজ্ব পালন করেন। আশেকে রসুল, নবী প্রেমে দেওয়ানা হযরত খাজাকে আল্লাহর রসুল (সঃ) নির্দেশ প্রদান করেন হিন্দুস্থান গমণ করার জন্য। সেখানকার বেলায়েত প্রদান করা হয় তাঁকে। নির্দেশ পাওয়ার পর একদিন চিন্তিত অবস্থায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন মইনুদ্দিন। সেই অবস্থায় দেখলেন, হজরত মোহাম্মদ (সঃ) তাঁর হাতে আজমীর শহরের দৃশ্য দেখিয়ে দিলেন সাথে দিলেন দিক নির্দেশনা। এরপর দয়াল নবী (সঃ) দিলেন একটি সুমিষ্ট আনার। হিন্দুস্থানের দিকে রওয়ানা দিলেন মইনুদ্দিন সাথে কুতুবুদ্দিন। প্রথমে লাহোর, লাহোর থেকে দিল্লী হয়ে মইনুদ্দিন আসেন আজমীর শহরে।

    ভারতবর্ষের তৎকালীন অবস্থা এবং মইনুদ্দীনের উপস্থিতি: 
    তৎকালীন ভারতবর্ষের শাসক ছিলেন শক্তিশালী পৃথ্বীরাজ। সেসময় ভারতবর্ষে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য। যাঁরা ছিলেন তাঁরাও আবার নানা প্রতিকুলতার মধ্যে দিনাতিপাত করতেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন (রঃ) প্রথমে হিন্দুস্থানে প্রবেশ করে লাহোরের দাতা গঞ্জেবক্স (রঃ) এর মাজারে চল্লিশ দিন অবস্থান করেন। অতপর তিনি আসেন দিল্লীতে। দিল্লীর শাসক ছিলেন পৃথ্বীরাজের ভাই খান্ডেরাও। সেখানে অবস্থানকালে তিনি ইসলাম প্রচারের মনোনিবেশ করেন এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ইসলামের ছায়াতলে আসার আহবান জানান। কিন্তু হিন্দুদের মাঝে এ প্রস্তাব মানা দু:সাধ্য হয়ে দেখা দেয়। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে বিফল হয়। দলে দলে বিধর্মীরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। অত:পর কুতুবুদ্দিন বকতিয়ার কাকীকে দিল্লী দায়িত্ব প্রদান করে খাজা মইনুদ্দিন (রহঃ) আসেন তাঁর জন্য নির্ধারিত স্থান আজমীরে।

    আজমীরে আনা সাগর নামে বিশাল এক হৃদ আছে। সেই হৃদের কাছে ছ্ট্টো একটি টিলায় সঙ্গীদের নিয়ে অবস্থানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন মাইনুদ্দিন (রহঃ)। আনা সাগরে আশে পাশেই রয়েছে অসংখ্য মন্দির। সন্ধ্যায় মন্দিরের শত শত মুর্তি পুজার ঘন্টার আওয়াজের সাথেই উচ্চাতি হয় আজানের ধ্বনি। আর তাতেই ম্লান হয়ে যায় পুজার ঘন্টার আওয়াজ। স্থানটি ছিল রাজকীয় প্রাসাদের প্রায় পাদদেশে। এদিকে আজমীরে আসার সময় হযরত খাজা রাজা পৃথ্বীরাজের উটের বিশ্রামের ঘরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে গিয়েছিলেন একটু বিশ্রামে জন্য। কিন্তু রাজ কর্মচারীরা বলে, এখান থেকে চলে যেতে এখানে উট বিশ্রাম নিবে। খাজা শুধু বললেন ঠিক আছে তোমাদের উটই বিশ্রাম করুক। পরের দিন সকালে দেখা যায়, উটগুলো একটি আর উঠছে না, সব শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। একথা রাজার কানে গেলে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ, জোতিষ শাস্ত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী রাজমাতা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এক মুসলমান ফকিরের অভিসম্পাতেই পৃথ্বীরাজের রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। কথাটি মনে হতেই তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। উটের কাহিনী শুনে বলেন, যাও তার কাছে মাফ চেয়ে আসো। কথামতো কর্মচারীরা খাজার কাছে মাফ চাওয়ার পর দেখলো উটগুলি যথারীতি উঠে দাঁড়িয়েছে এবং স্বাভাবিক আচরণ করছে।

    আস্তে আস্তে লোক সমাগম বাড়তে থাকে খাজা মইনুদ্দিনের দরবারে, হতে থাকে মুসলমান। কোন বাধাই কাজে আসছে না পৃথ্বীরাজের। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ হিন্দু স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হচ্ছে। এতো ভয় দেখানোর পর শতছিন্ন বস্ত্র পরিহিত নিরস্ত্র বৃদ্ধার কোন ভয় নেই, নেই কোন শংকা। ভীত হয়ে পড়ে রাজা, হিন্দু সমাজপতি ও পুরোহিতরা। কি করবে ভেবে পায় না রাজা পৃথ্বীরাজ। অনেক ভেবে চিন্তে পৃথ্বীরাজ ঠিক করলেন, হিন্দু ধর্মের আধ্যাতিক সিদ্ধ পূরুষদের দ্বারা প্রতিরোধ করতে হবে ফকিরকে। দায়িত্ব দেয়া হলো এদের প্রধান রামদেও কে। রামদেও ও রাজি হলেন। তার দীর্ঘ সাধনালব্ধ আধ্যাত্বিক শক্তিতে হযরত খাজা চিশ্্তী (রঃ) কে পরাস্ত করার জন্য তৎক্ষনাৎ উপস্থিত হলেন খাজার দরবারে। খাজা তখন ছিলেন ধ্যানমগ্ন। ধ্যানমুক্ত হয়ে খাজা রামদেও এর উপর চোখ ফেলতেই সমস্ত সাধনা মুহুর্তের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মুগ্ন হয়ে গেলেন রামদেও এবং কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনাা করে খাজার কদম মোবারকে লুটিয়ে পড়েন। স্বীকার করেন ইসলাম ধর্মকে। রামদেও মুসলমান হওয়ার পর নাম রাখেন মোহাম্মদ সাদী।

    এতদিন আনা সাগর এর পানি উচ্চ বর্ণে হিন্দু এবং পুরোহিত ছাড়া অন্য কেউ ব্যবহার করতে পারতোনা। একদিন খাজার একজন শাগরেদ আনা সাগরে অজু করতে গেলে সেখানকার পুরোহিত তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। শাগরেদ পুরো ঘটনা খাজার কাছে পেশ করলে উনি এক ঘটি পানি আনতে বলেন আনা সাগর থেকে। পানি আনার সাথে সাথে দেখা গেল সমস্ত আনা সাগর শুকিয়ে গেছে। এক ফোঁটা পানিও নেই। একথা রাজার কানে পৌঁছালে তিনি বুঝতে পারলেন, মুসলমানদের পানি ব্যবহার করতে না দেয়াতে এ রকম হয়েছে। তাৎক্ষণিক রাজা পুরোহিতদের পাঠালেন খাজার কাছে মাফ চাওয়ার জন্য। নিজেদের ভুল স্বীকার করার পর মোহাম্মদ সাদীকে ঘটির পানি আনা সাগরে ফেলে দিয়ে আসতে বলেন। সাদী আনা সাগরে পানি ফেলা মাত্র আনা সাগর আবার পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে।

    রাজার অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। কোন কিছুই কাজে আসছে না। একদিন রাজদরবারে অজয় পাল নামে এক ঐন্দ্রজালিক এর সাহায্য নেয়ার জন্য বলে রাজার ঘনিষ্ঠজনেরা। বিশেষ পুরস্কারের কথা বলে অজয় পালকে রাজি করানো হয় খাজা মইনুদ্দিনকে শায়েস্তা করার জন্য। অজয় পাল তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেন খাজার দিকে। কিন্তু মিথ্যা হয়ে যায় সবকিছু। অজয় পাল বুঝতে সক্ষম হলেন, সত্য এসেছে, এখানে মিথ্যা পরাজিত হবেই। কাল বিলম্ব না করে অজয় পাল তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে কবুল করেন দ্বীন ইসলাম। হজরত খাজা তার নাম রাখেন আব্দুল্লাহ বিয়াবানী। এ সংবাদ শুনে মুসড়ে পড়েন রাজা পৃথ্বীরাজ। এখন থেকে আর বিরুদ্ধাচারণ না করে সহাবস্থানের কৌশল নেয় রাজা। এমনি হাজারো অলৌকিক ঘটনার সাথে লোক সমাগম বৃদ্ধি পেতে থাকে প্রতিদিন। বাড়তে থাকে মুসলমানের সংখ্যা।

    এদিকে ঐ পৃথ্বীরাজের দরবারে কাজ করতো খাজার এক মুরিদ। রাজা তাঁর সম্পর্কে সব জেনেও সততা, বিশ্বস্ততা ও উত্তম স্বভাবের কারণে তাঁকে পছন্দ করতেন। কিন্তু রাজ দরবারের অন্যান্যদের প্ররোচনায় একদিন রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন ঔ কর্মচারীর উপর। কর্মচারীটি খাজার কাছে সবকিছু বলার পর তার চাহিদানুযায়ী খাজা একটি সুপারিশ পত্র লিখে পাঠান রাজার কাছে। এতে রাজা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে কর্মচারীটিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে এবং খাজাকে গালাগাল দেয়। সংবাদ শুনে হজরত খাজার প্রেমময় অন্তরেও প্রজ্জলিত হলো রুদ্ররোষের সর্বধ্বংসী আগুন। তিনি একটুকরো কাগজে লিখে পাঠালেন রাজা পৃথ্বীরাজকে, ‘মান তোরা যেন্দা বদন্তে লশকরে ইসলাম বছোপর্দম’ অর্থাৎ আমি তোমাকে তোমার জীবিতাবস্থাতেই মুসলিম সেনাদলের হাতে সমর্পন করলাম।

    ৫৮৮ সাল। সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘোরী একরাতে স্বপ্নে দেখেন, এক স্বেত শুভ্র বস্ত্রাবৃত একজন জ্যোতির্ময় পুরুষ তাকে বলছে, যাও তোমাকে হিন্দুস্থানের শাসন ক্ষমতা প্রদান করলাম। তিনি বুঝতে পারলেন হয়তো এটি তাঁর আগাম কোন সুসংবাদ। এর কিছুদিন পরই তিনি তার বিশাল বাহিনী নিয়ে হিন্দুস্থান অভিমুখে রওয়ানা হলেন। ইতিপূর্বে পৃথ্বীরাজের কাছে দুই দুইবার পরাজিত হয়েছেন তিনি। যার গ্লানি মুছে ফেলতে এবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন। হজরত খাজার দোয়ার বরকতে সুলতান শাহাবুদ্দিন একে একে ভারত বর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করতে লাগলেন। প্রবল পরাক্রমশালী রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজের হিন্দু বাহিনীর প্রধান সেনাপতি রাজার ভাই খান্ডেরাও। সৈন্য সংখ্যা তিন লক্ষ। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম সৈন্য নিয়ে ইমানী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এক আল্লাহ্র সাহায্যে আর গরীবে নেওয়াজের রূহানী তাওয়াজ্জোকে পুঁজি করে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক বিজয়ের ঝান্ডা নিয়ে এগিয়ে চলছেন বীরদর্পে। পরাজিত হলো পৌত্তলিক বাহিনী মুসলিম বাহিনীর কাছে। ভাই খান্ডেরাও পালিয়ে বাঁচলেও রাজা স্বরস্বতী নদীর কাছে বন্দি ও পরে নিহত হন। আজমীরে হজরত খাজার দরবারে লোকের ভীড় দিনকে দিন বাড়তেই থাকে। বাড়তে থাকে মুসলমানের সংখ্যা।

    সংসার জীবন:
    খাজা মইনুদ্দিনের বয়স আশি বছর। আল্লাহ ও রসুল (সঃ) এর প্রেমসমুদ্রে অন্তহীন অতলে পরিভ্রমণ যাঁর একমাত্র লক্ষ্য, সংসার জীবন কি তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারে? সাধনা, সৃষ্টিকুলের খেদমত আর কর্মব্যস্ততায় মনে হয়নি কখনো সংসারি হবেন। হজরত রসুল (সাঃ) এর নির্দেশে আশি বছর বয়সে হজরত জাফর সাদেক (রঃ) এর কন্যা বিবি আছমাতুল্লাকে বিবাহ করেন। ঐ বছর আরো একটি বিবাহ করতে হয় হজরত খাজাকে। এ বিয়ে নিয়ে আছে আল্লাহ পাকের অদৃশ্য ইশারা। খাজার এক নিষ্ঠাবান মুরিদ পাটালীর শাসকের অধীনে রাজপুত সামন্ত বাহিনীর সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধ পরাজিত রাজা ধনসম্পদের সাথে রাজকন্যাও তাঁর অধিকারে আসে। তিনি রাজকন্যাকে খাজার দরবারে নিয়ে আসলে রাজকন্যা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আল্লাহ্ নির্দেশে তাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর তাঁর নাম রাখা হয় আমাতুল্লাহ। আল্লাহ পাক সন্তান সন্ততি দিয়েও পুরস্কৃত করেন খাজাকে। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন তিন ছেলে খাজা ফখরুদ্দিন আবুল খায়ের (রঃ), খাজা জিয়াউদ্দিন আবু ছাইদ (রঃ) এবং খাজা হোছামুদ্দিন আবু ছালেহ (রঃ)। আর দ্বিতীয় স্ত্রীর কোল জুড়ে জন্ম নেন একমাত্র কন্যা সৈয়দা বিবি হাফেজা জামাল (রঃ)।

    পরলোক:
    ৬৩৩ হিজরীর ৬ রজব রোববার হজরত খাজা মইনুদ্দিন হাসান চিশতী (রঃ) আজমীর শরীফে ইহলোক ত্যাগ করেন । রুহ মোবারক ত্যাগ করার পর তাঁর পেশানী মোবারক (ললাটে) নূরের অক্ষরে লেখা ছিল “মাতা হাবীবুললাহ ফি হুব্বিল্লাহু” অর্থাৎ খোদার প্রেমে খোদার বন্ধু বিদায় নিল।

    আরও পড়তে পারেন: সিলেটে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস

    Print Friendly, PDF & Email