Home কর্পোরেট সংবাদ কর্পোরেট ক্রাইম সম্পদের পাহাড় গড়লেও ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে না ইমাম গ্রুপ

সম্পদের পাহাড় গড়লেও ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে না ইমাম গ্রুপ

Staff reporter (s)

Published: 14:39:36
76
0

image_pdfimage_print

ডেস্ক রিপোর্টঃ নব্বইয়ের দশকে পণ্য আমদানির ব্যবসা শুরু করেন ইমাম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ আলী। ২০০০ সালের পর ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন অন্যান্য খাতেও। ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি কৃষি, খাদ্য, মোটর পার্টস ও পোশাক শিল্পের নামে ঋণ নিয়ে একের পর এক সম্পদ বাড়াতে থাকেন। কেনেন বিপুল পরিমাণ জমিও। এর মাধ্যমে ইমাম গ্রুপের সম্পদ স্ফীত হলেও পরিশোধ করছে না ব্যাংকঋণ।খবর বণিক বার্তা’র।

চট্টগ্রামের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রথম দিককার ঋণখেলাপি ইমাম গ্রুপের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। পাওনা আদায়ে বেশির ভাগ ব্যাংকই ২০১২-১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির কাছে সবচেয়ে বড় অংকের ঋণ আটকে গেছে ন্যাশনাল ব্যাংকের। ইমাম গ্রুপের মাস্টার ট্রেডিংয়ের কাছে ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখার পাওনা প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা। পাওনা আদায়ে ২০১২ সালে অর্থঋণ আদালতে মামলা করলেও টাকা উদ্ধার হয়নি। অর্থঋণ আদালতে রায়ের পর এখন টাকা উদ্ধার জারি মামলা চলছে। তবে এ মামলার বিপরীতে উচ্চ আদালত স্থিতাবস্থা দিয়েছেন।

ইমাম গ্রুপকে ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে সোনালী ব্যাংকও। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে সোনালী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার পাওনা প্রায় ১৩১ কোটি টাকা। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে মেসার্স ইমাম ট্রেডার্সের নামে এ ঋণ নেয়া হয়। ২০১২ সালে মামলা দায়েরের পরও এখনো উদ্ধার হয়নি ২০১০ সালে দেয়া ঋণের টাকা। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির কোনো জামানত বা বন্ধকি সম্পত্তিও নেই। তাই ঋণের টাকা উদ্ধারে শঙ্কিত ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ২০১০-১১ সালে এলটিআর সুবিধায় এ ঋণ নেয় মেসার্স ইমাম ট্রেডার্স। এরপর প্রায় আট বছর পেরিয়ে গেলেও ঋণের টাকা পরিশোধ করেননি প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী। নিয়ম অনুযায়ী মামলা দায়ের করলেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো জামানত না থাকায় অর্থ উদ্ধার কঠিন হচ্ছে। ব্যাংকে থাকা মোহাম্মদ আলীর ৮ কোটি টাকা এফডিআর সমন্বয় করার পর এখনো প্রায় ১৩১ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

ইমাম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আনিকা এন্টারপ্রাইজকে ঋণ দিয়েছিল কৃষি ব্যাংক ষোলশহর শাখা। কৃষি প্রকল্পে বিনিয়োগের নামে ঋণ নিয়ে জমি কেনেন

মোহাম্মদ আলী। কিন্তু সময়মতো ঋণের অর্থ পরিশোধ করেননি তিনি। বর্তমানে ইমাম গ্রুপের কাছে এ ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা। টাকা আদায়ে ২০১৩ সালে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে কৃষি ব্যাংক।

মেসার্স রোমানা এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করতেন ইমাম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ আলী। এ প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক এশিয়া আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণ নেন তিনি। ২০০৪-০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ সুবিধা দিলেও এখনো তা ফেরত পায়নি ব্যাংকটি। ঋণের টাকা উদ্ধারে ২০১২ সালে ব্যাংকের পক্ষ থেকে মামলা করেও কোনো কাজ হয়নি। উচ্চ আদালত থেকে মামলার স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১২ সাল পর্যন্ত ইমাম গ্রুপের কাছে ব্যাংক এশিয়ার পাওনা প্রায় ১৮ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আগ্রাবাদ শাখাপ্রধান একেএম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ভোগ্যপণ্যে একসময় ভালো ব্যবসা করত ইমাম গ্রুপ। ব্যবসায়িক ভলিউম ও ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন ভালো হওয়ায় ওই সময় ইমাম গ্রুপ ঋণটি পায়। কিন্তু একটা সময় পর প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহ দেখায়। মামলা দায়েরের পরও প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ঋণের টাকা উদ্ধার নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। কারণ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির কোনো জামানত নেই।

ভোগ্যপণ্য ব্যবসার নামে উত্তরা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকেও বড় অংকের ঋণ নেয় ইমাম গ্রুপ। ২০০৮ সালে এ ঋণ সুবিধা নিলেও এখনো তা পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে ইমাম গ্রুপের কাছে উত্তরা ব্যাংকের পাওনা ৬১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০১৩ সালে এ ঋণ আদায়ে মামলা করলেও টাকা আদায় সম্ভব হয়নি। এ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির নগরীর পতেঙ্গা এলাকার ৫১৩ শতক জমি বন্ধক রয়েছে।

এর বাইরে ইমাম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে আইএফআইসি ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৬১ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক জুবিলি রোড শাখার ৪৭ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৩৪ কোটি, ডাচ্-বাংলার ১৯ কোটি, যমুনা ব্যাংকের ১০ কোটি, ন্যাশনাল হাউজিং জিইসি শাখার ৮ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৪ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) জুবিলি রোড শাখার ২ কোটি ও অগ্রণী ব্যাংক লালদীঘি শাখার দেড় কোটি টাকা।

ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ১৯ কোটি টাকা এরই মধ্যে পুনঃতফসিল ও ইউসিবির আড়াই কোটি টাকা পরিশোধের জন্য সোলেনামা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া ২০১৬ সালে ইমাম গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৬৫ কোটি টাকা পাওনা আদায়ে এক্সিম ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা মামলা করলে গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে এ ঋণ পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

জানতে চাইলে ইমাম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ আলী বলেন, ২০১০-১২ সালের মধ্যে ভোগ্যপণ্য ও গার্মেন্ট খাতের ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হয়। ফলে বিভিন্ন ব্যাংকে হঠাৎ করে খেলাপি হয়ে পড়ি। এমনকি ওই সময় ভূমি ব্যবসায়ও ধস নামায় জায়গা-জমি বিক্রি করে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। তবে দুই বছর ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের চেষ্টা করছি। এক্সিম ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে। ইউসিবির পাওনা পরিশোধেও এরই মধ্যে সোলেনামা করা হয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখার ৭ কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।

একসময় খাতুনগঞ্জের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় বড় প্রতিষ্ঠান ছিল মোহাম্মদ আলীর মেসার্স ইমাম ট্রেডার্স। নব্বইয়ের দশকে খাতুনগঞ্জের ভোগ্যপণ্যের অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করত প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে ভোগ্যপণ্য থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন পোশাক শিল্প, যন্ত্রপাতি আমদানিসহ নানা খাতে। এসব খাতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিলেও পরে সেই টাকার বেশির ভাগ বিনিয়োগ করেন জমি কেনায়। বর্তমানে ইমাম গার্মেন্টস, মুন ফ্যাশন, ইমাম বাটন, ঢাকার শ্যামপুরে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও ইমাম প্যাকেজ অ্যাকসেসরিজ চালু রয়েছে। তাছাড়া ছোট পরিসরে ভোগ্যপণ্য আমদানি ব্যবসাও করছে ইমাম গ্রুপ। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর জমি রয়েছে ইমাম গ্রুপের। বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে ডাঙ্গাচর এলাকায় কয়েক একর জমি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

আরও পড়ুনঃ 

এবার রাজধানীতে বাসচাপায় বিচ্ছিন্ন হল নারীর পা

Print Friendly, PDF & Email