Home আর্কাইভ সোনালী ব্যাংক ইউকে শাখার বিপর্যয় কাটছে না

সোনালী ব্যাংক ইউকে শাখার বিপর্যয় কাটছে না

Beximco-Synthetic-Logo
Beximco-Pharma
Beximco-Synthetic-Logo
Sonali-bank
Staff Reporter (U)

Published: ডিসেম্বর ৭, ২০১৭ ১১:০৪:৪৭
49
0

সোনালী ব্যাংক ইউকের ছয় শাখার মধ্যে চারটিই বন্ধ হয়ে গেছে। ২২টি ভস্ট্রো অ্যাকাউন্টের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র একটি। এ অবস্থায় মুমূর্ষু ব্যাংকটিকে টেনে তুলতে গত এপ্রিলে ৩৫০ কোটি টাকা (৩ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড) মূলধন জোগান দেয়া হয়েছে। যদিও ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, শুধু রেমিট্যান্স গ্রহণের জন্য কার্যক্রম চালাতে গেলে অল্প দিনেই মূলধন হারিয়ে দেউলিয়াত্বের পথে পা বাড়াবে সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেড।

জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির কারণে সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেডের এগিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। কার্যক্রম শুরুর কয়েক বছর পর আর্থিক বিপর্যয় শুরু হয় ব্যাংকটিতে। ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো সরকারকে লভ্যাংশ দেয় সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেড। কিন্তু পরের বছরই আসে নতুন বিপর্যয়। ২০১৩ সালের জুনে ব্যাংকের ওল্ডহ্যাম শাখা থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার আত্মসাত্ করেন তত্কালীন শাখা ব্যবস্থাপক ইকবাল আহমেদ। এতে বড় ধরনের লোকসানে পড়ে ম্যানচেস্টার অঞ্চলের ওই শাখা। পরে ২০১৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর শাখাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর গত বছর বন্ধ হয়ে যায় ব্যাংকের ব্র্যাডফোর্ড, কেমডেন ও লুটন শাখা। বর্তমানে শুধু বার্মিংহাম ও লন্ডনের প্রধান শাখাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে সোনালী ব্যাংক ইউকের কার্যক্রম।

এরই মধ্যে নতুন বিপত্তির মুখোমুখি হয় সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেড। অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন প্রতিপালনে শৈথিল্যের অভিযোগে যুক্তরাজ্যের ফিন্যান্সিয়াল কনডাক্ট অথরিটি (এফসিএ) ৩২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৩৫ কোটি টাকা) অর্থদণ্ড করে ব্যাংকটিকে। ২০১৪ সালের ওই দণ্ডের অর্থ পরিশোধ করেছে ব্যাংকটি। ২০১৫ সালে পুরোপুরি পথ হারায় সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেড। ওই বছর ব্যাংকটি ১৭ লাখ পাউন্ড লোকসান দেয়। এরপর গত বছর ৩ লাখ ৯০ হাজার পাউন্ড লোকসান গুনেছে সোনালী ব্যাংক (ইউকে)। চলতি বছর আরো বড় অংকের লোকসান দিতে যাচ্ছে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাংকটি।

লোকসানের কলেবর বড় হতে থাকলেও ছোট হয়ে এসেছে সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেডের ব্যবসা। এত দিন রেমিট্যান্স সংগ্রহের পাশাপাশি দেশীয় ২২টি ব্যাংকের ‘নস্ট্রো’ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করত ব্যাংকটি। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ডলার, ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ড এ তিন মুদ্রায় ক্লিয়ারিং কার্যক্রম পরিচালনা করত সোনালী ব্যাংক ইউকে। বাংলাদেশের ২২টি ব্যাংকের এলসিসহ বিভিন্ন দেনা পরিশোধ থেকেই আসত সোনালী ব্যাংকের (ইউকে) আয়ের বড় অংশ। কিন্তু চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকটির ২১টি ভস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই)। এখন সচল রয়েছে শুধু সোনালী ব্যাংকের নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট।

নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি ১৬৮ দিন নতুন গ্রাহকের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহের বিষয়েও সোনালী ব্যাংকের (ইউকে) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। ফলে ব্যাংকটির কার্যক্রম এখন শুধু রেমিট্যান্স গ্রহণেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। যদিও রেমিট্যান্স আহরণের জন্য যুক্তরাজ্যে দেশের ১১টি ব্যাংকের রেমিট্যান্স হাউজ রয়েছে। এ অবস্থায় বিপুল সংখ্যক জনবল ও বড় অংকের পরিচালন ব্যয় বহন করে ব্যাংকটিকে পরিচালনা করা দুঃসাধ্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে ব্যাংকটিকে এখনো বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনুসুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেডকে এরই মধ্যে নতুন করে মূলধন সরবরাহ করা হয়েছে। আমরা ব্যাংকটিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। সোনালী ব্যাংকও নিজেদের মতো চেষ্টা করছে। ব্যাংকটির ভবিষ্যত্ এখনই বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৭২ অনুযায়ী ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানসহ অন্য দুটি ব্যাংককে একীভূত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় সোনালী ব্যাংক। সে সময় থেকেই যুক্তরাজ্যে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। ২০০১ সালে শাখাটিকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকে রূপান্তর করে নাম দেয়া হয় সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেড। সরকারের ৫১ শতাংশ ও সোনালী ব্যাংকের ৪৯ শতাংশ মালিকানার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটিকে প্রতিষ্ঠালগ্নে আড়াই কোটি পাউন্ড মূলধন জোগান দেয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে যুক্তরাজ্যে ছয়টি শাখা চালু করে ব্যাংকটি।

কয়েক বছর লোকসানের পর ২০১২ সালে ৭ লাখ ৬৫ হাজার পাউন্ড মুনাফা করে সোনালী ব্যাংক ইউকে। এরপর ২০১৩ সালে ৩০ লাখ ২৩ হাজার পাউন্ড ও ২০১৪ সালে ২০ লাখ ১৫ হাজার পাউন্ড মুনাফা করে ব্যাংকটি। এ সময় সোনালী ব্যাংক ইউকের প্রধান নির্বাহী ছিলেন রূপালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংক ইউকের দায়িত্ব নেয়ার পর ওই বছরই প্রথমবারের মতো ব্যাংকটির মুনাফা থেকে সরকারকে ৪ লাখ ডলার ডিভিডেন্ড দেয়া হয়েছে। এর পরের বছর ২০১৩ সালে আবারো মুনাফা থেকে ১০ লাখ ডলার সরকারকে ডিভিডেন্ড দেয়া হয়। দায়িত্ব পালনকালে ব্যাংকটিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছি। তিনি বলেন, ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেয়া হয়নি। অনেক অযোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। ফলে যে উদ্দেশ্যে ব্যাংকটির যাত্রা হয়েছিল, তা লক্ষ্যচ্যুত হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সোনালী ব্যাংক ইউকের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।

সোনালী ব্যাংক ইউকের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে এলসির বিল পরিশোধ করত এমন একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ব্যাংকটির সঙ্গে থাকা নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এজন্য এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিটি ব্যাংক এনএ, ব্যাংক অব সিলনসহ অন্যান্য বহুজাতিক ব্যাংকের মাধ্যমে আমরা লেনদেন করছি। সোনালী ব্যাংক ইউকের সঙ্গে থাকা নস্ট্রো অ্যাকাউন্টগুলো সচল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।

এ ব্যাপারে সোনালী ব্যাংকের একটি সূত্র বলেছে, সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেডে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ব্যাংকটিকে আবার দাঁড় করাতে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তরিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সোনালী ব্যাংক ইউকেতে যোগ্যতাসম্পন্ন একজন নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ব্যাংকটি যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেজন্য মূলধন সরবরাহসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে অনিয়মে অভিযুক্তদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আরো কয়েকজনকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয়েছে। ব্যাংকটির ভবিষ্যত্ মঙ্গলের জন্যই এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

লোকসানে পড়ায় এবং নিয়ম মেনে মূলধন বৃদ্ধির প্রয়োজনে গত এপ্রিলে সোনালী ব্যাংক (ইউকে) লিমিটেডকে ৩৫০ কোটি টাকা (৩ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড) জোগান দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মালিকানা অংশের ভিত্তিতে সরকার ১৭৮ কোটি এবং সোনালী ব্যাংক দিয়েছে ১৭১ কোটি টাকা। সবমিলে বর্তমানে ব্যাংকটির ইকুইটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৭৩ হাজার পাউন্ড। বণিক বার্তা

অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ

নিয়মিত সংবাদ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

Logo
BSCCL-logo