Home আর্কাইভ অসাধু কোম্পানি সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড!

অসাধু কোম্পানি সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড!

Beximco-Synthetic-Logo
teer
Staff Reporter (U)

Published: December 7, 2017 11:22:51
2418
0

কাঁচামাল আমদানির বিপরীতে প্রযোজ্য রাজস্ব পরিশোধ করেনি সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। যদিও সরকারি এসব নিয়মনীতি না মানার অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নতুন নয়। এর আগেও চিনির বাজারে সংকট সৃষ্টি করে বাড়তি মুনাফা তুলে নেয়ার একাধিক নজির সৃষ্টি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বছর রমজানে চিনির বাজারের যে অস্থিরতা, তার নেপথ্যে ছিল তারাই। অভিযোগ আছে, চিনিকেন্দ্রিক এ ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়েই স্ফীত হচ্ছে সিটি গ্রুপ।

গ্রুপটির অসাধু কর্মকাণ্ডের সর্বশেষ নজির কাঁচামাল আমদানিতে বড় অংকের রাজস্ব ফাঁকি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তদন্ত অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আনা ২ লাখ ২ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি বন্ড রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করেও শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই তা কারখানা থেকে অপসারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ২৮০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে গ্রুপটি।

সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের এ অভিযোগ অনুসন্ধান করেছে এনবিআরের কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকার একটি প্রিভেনটিভ টিম। অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় প্রাথমিক দাবিনামাসহ কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি বরাবর। ৩০ নভেম্বর ইস্যু করা ওই নোটিসে নিয়মবহির্ভূতভাবে কাঁচামাল অপসারণ করায় শুল্কায়িত ২৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা কেন দাবি করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এ অপরাধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তারও কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে নোটিসে। অর্থ পরিশোধসহ কোম্পানির পক্ষ থেকে শুনানিতে অংশ নিতে চাইলে ১৫ দিনের মধ্যে জানাতে হবে সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজকে।

স্থানীয় শিল্প বিকাশে প্রণোদনা হিসেবে কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ বন্ড সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। এ সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে একসঙ্গে বড় পরিসরে কাঁচামাল এনে এনবিআরের তত্ত্বাবধানে রেখে রাজস্ব পরিশোধসাপেক্ষে ধীরে ধীরে তা ব্যবহারের সুযোগ পায় কোম্পানিগুলো।

সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ এ নিয়ম মানেনি বলে জানান এনবিআরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ছয় মাসের আগে ব্যবহার করবে না, এ শর্তে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ। শুল্ক প্রণোদনায় আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি ওই সময় পর্যন্ত কারখানার গুদামে রাখার কথা। তবে জরুরি প্রয়োজনে এনবিআরের অনুমোদন নিয়ে সব ধরনের রাজস্ব পরিশোধসাপেক্ষে তা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সিটি সুগারের কারখানা পরিদর্শনে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি অপসারণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। রাজস্ব পরিশোধ না করে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল অপসারণ করা হলেও এনবিআরকে অবহিত করা হয়নি, যা রাজস্ব ফাঁকি হিসেবে গণ্য।

এনবিআরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৮টি চালানে বন্ড সুবিধার আওতায় ২ লাখ ১ হাজার ৯০০ টন অপরিশোধিত চিনি রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে সিটি সুগার। ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী, শুল্কায়নযোগ্য ৬১৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার কাঁচামালের বিপরীতে পরিশোধযোগ্য রাজস্ব ২৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে কাস্টমস শুল্ক ৪০ কোটি ৩৮ লাখ, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ১২২ কোটি ৭৮ লাখ ও ভ্যাট ১১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। প্রযোজ্য রাজস্বের কোনো অর্থই পরিশোধ ছাড়া তা কারখানা থেকে অপসারণ করেছে সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিত্ সাহা বলেন, ‘বন্ড কমিশনারেট থেকে এ ধরনের কোনো চিঠি আমরা এখনো পাইনি। চিঠি পেলে কোম্পানির পক্ষ থেকে বক্তব্য জানানো হবে।’ যদিও এনবিআরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিঠির কপি এরই মধ্যে কোম্পানিটির কাছে পৌঁছেছে এবং এ নিয়ে তারা এনবিআরের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের উত্তর রূপসী এলাকায় অবস্থিত মেসার্স সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ২০১১ সালে বন্ড লাইন্সেস দেয় এনবিআর। এর আওতায় কাঁচামাল হিসেবে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি এনে পরিশোধনের পর ‘তীর’ ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত করছে প্রতিষ্ঠানটি। উত্পাদিত চিনি বাজারজাতকরণেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অসাধুতার অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের রমজানে সারা দেশে চিনির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিল সিটি গ্রুপ। ছয় মাসের ব্যবধানে সে সময় চিনির দাম টনপ্রতি ৬০০ টাকার বেশি বেড়ে যায়। ঈদের আগে আগে দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে আসতে থাকলে সিটি গ্রুপ তাদের চিনি সরবরাহ প্রায় ১০ দিন বন্ধ রাখে। এতে আবারো অস্থির হয়ে ওঠে পণ্যটির বাজার। যদিও বাজারে চিনি সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ। বাণিজ্যমন্ত্রীকে দেয়া ওই প্রতিশ্রুতিও পরে ভঙ্গ করে প্রতিষ্ঠানটি।

গত বছরের ওই পর্যায়ে না গেলেও চলতি বছর রমজানেও চিনির বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এবারো মুখ্য ভূমিকা রাখে সিটি গ্রুপ। বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে বাজারে চিনির সরবরাহ কমিয়ে দেয় তারা। এর মাধ্যমে গ্রুপটি চিনির বাজারকে উসকে দেয় বলে জানান পাইকারি চিনি ব্যবসায়ীরা।

চিনির বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে চলতি বছরও সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজকে তলব করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে তাদের সতর্কও করা হয়। গতকাল যোগাযোগ করা হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুন্সী শফিউল হক বলেন, ভোগ্যপণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক হলেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ডেকে সতর্ক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ রমজানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ নিয়ে সভা হয়। রমজানের শুরুতে চিনির সংকট নিয়ে সিটি গ্রুপকে তলব করা হয়েছিল। সেখানে বাজারে সংকট সৃষ্টি না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।

সিটি গ্রুপ দেশের ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী। গ্রুপের ২৩টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ চিনি শিল্পে দেশের সর্ববৃহত্ প্রতিষ্ঠান। ২০০৬ সালে বাণিজ্যিক উত্পাদনে আসা কোম্পানিটি দুটি ইউনিটে দৈনিক পাঁচ হাজার টন চিনি উত্পাদন করে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের আমদানি তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ অর্থবছর মোট ২১ লাখ ৭৫ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করা হয়, যার আর্থিক মূল্য ৭ হাজার ৯৩৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বেসরকারি খাতে আমদানি করা এ অপরিশোধিত চিনির বড় অংশ ছিল সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের। অর্থবছরটিতে প্রতিষ্ঠানটির অপরিশোধিত চিনি আমদানির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৮৯ হাজার টন, যার আর্থিক মূল্য ৩ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। সূত্র: বণিক বার্তা

অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ

নিয়মিত সংবাদ পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

Logo
BSCCL-logo