ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে দেশের সকল নাগরিককে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার মূল দায়িত্ব নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ও স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

রাজধানীর সার্বিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি, রোগীদের চিকিৎসাসেবা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে শনিবার সকালে আকস্মিক পরিদর্শনে বের হন প্রধানমন্ত্রী।
দিনের শুরুতে তিনি রাজধানীর কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং তাঁদের সেবার খোঁজখবর নেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) ও অস্ত্রোপচারকক্ষসহ (অপারেশন থিয়েটার) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ঘুরে দেখেন।
তবে পরিদর্শনকালে হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। পরিবেশের দ্রুতোন্নয়ন ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে দেন প্রধানমন্ত্রী।

হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে যান। সেখানে তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বছরের এই সময়ে, বিশেষ করে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক রূপ নেয়। প্রতিবছর এতে বহু মানুষ আক্রান্ত হন এবং অনেকের প্রাণহানি ঘটে। ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করতে হলে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। আর এর জন্য আমাদের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এই কাজে আমি তরুণদের সাহায্য চাই।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি নিজেদের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিজ কাঁধে নেয়, তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধসহ পরিবেশ রক্ষায় এক বিশাল পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ঢাকা শহরের পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় আড়াই কোটির বেশি মানুষের এই বিশাল নগরীতে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত কাজ করলেও তাঁদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই শুধু সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, নাগরিকদেরও নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “তোমরা স্কাউট, গার্ল গাইড বা রেড ক্রিসেন্টের সদস্য হও আর না হও—তোমরা সবাই এই দেশের নাগরিক এবং তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাই নিজের বাসা, স্কুল, পাড়া ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব তোমাদেরই নিতে হবে।”
এ সময় যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তিনি। কেউ নির্ধারিত স্থানের বাইরে ময়লা ফেললে তাঁকে ধরে বুঝিয়ে সচেতন করার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিদর্শনকালে নগরীর সার্বিক উন্নয়নকাজে কিছু সামাজিক বাধার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আফসোস প্রকাশ করে জানান, নগরীর বিভিন্ন স্থানে ময়লা ফেলার জন্য ডাস্টবিন স্থাপন করা হলেও দুঃখজনকভাবে তা চুরি হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে লাগানো সবুজ গাছের চারাও চুরি হচ্ছে। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নাগরিকদের আরও বেশি সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও সবুজের ঘাটতি নিয়ে নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “একসময় ঢাকায় প্রচুর গাছপালা ও খোলা জায়গা ছিল। এখন সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, যার ফলে গরমের অনুভূতিও বেড়েছে। গাছ যত বাড়বে, আমরা তত বুক ভরে শ্বাস নিতে পারব।”
পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের জন্মদিনে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন—ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং সবুজায়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
আলাপচারিতার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান, তারা নিজ নিজ স্কুল, বাসা ও এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখতে সরকারকে সহযোগিতা করবে কি না। এ সময় সকল শিক্ষার্থী একযোগে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।