"জনগণের অর্থ কোনোভাবেই বিদেশে পাচার হতে দেওয়া হবে না; বরং তা জনগণের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হবে" বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রধানমন্ত্রীর শ্রীমঙ্গলে আগমনকে কেন্দ্র করে সেখানে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। অনুষ্ঠান শেষে তিনি চা-শ্রমিকদের মাঝে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ করেন।
অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই নানা কথা ও বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়। তারা প্রশ্ন তোলে—ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের টাকা কোথা থেকে আসবে? আপনাদের সবাইকে সাক্ষী রেখে তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, বিগত এক যুগ ধরে জনগণের যে অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে গিয়েছিল, আমরা তা আর হতে দেব না। জনগণের টাকা দিয়ে জনগণের জন্যই কাজ করা হবে, দেশের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কাজ করা হবে। কাজেই ইনশাআল্লাহ টাকার কোনো অভাব হবে না।
টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, "যারা এই দেশ থেকে জনগণের অর্থ বিদেশে পাঠাতে চায়, আজ থেকে তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করব। আমরা যদি সকলে চোখ-কান খোলা রাখি, তাহলে এ দেশের অর্থ কেউ বিদেশে পাচার করতে পারবে না। আমরা সকলে মিলে পরিশ্রম করব এবং সেই অর্থ দিয়ে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করব।" এ সময় দেশের মানুষের ভাগ্য বদলে সরকারের উদ্যোগের সাথে সকলে আছেন কি না—প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রশ্নের জবাবে উপস্থিত হাজার হাজার চা-শ্রমিকসহ শ্রীমঙ্গলের সর্বস্তরের নারী-পুরুষ সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন।
পবিত্র কোরআনসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে প্রথমে জাতীয় সঙ্গীত এবং পরে বিএনপির দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানে ১০ জন নারীর হাতে সরাসরি ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী কম্পিউটারের বাটন চেপে ‘ফ্যামিলি কার্ড তৃতীয় পর্যায়’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
একই সঙ্গে চা-শ্রমিকদের আবাসন সমস্যা সমাধানে প্রতি শ্রমিককে দুই লাখ টাকা করে অনুদান, চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য বৃত্তি এবং প্রতিবন্ধীদের মাঝে আর্থিক অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী। মঞ্চে তিনজনের হাতে সরাসরি ২ লাখ টাকার চেক তুলে দেওয়া হয় এবং বাকিদের টাকা প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
বিএনপি-কে গণমানুষের দল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "বিএনপি সবসময় জনগণের কাতারে ছিল, সেজন্যই বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের শক্তি। জনগণই আমাদের সকল ক্ষমতার উৎস। যতবার ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে, দেশের মানুষ বিএনপি-কে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এনেছে।"
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তিনি বলেন, "আমরা দেখেছি বিভিন্ন সময়ে যখন দেশের জনগণ গণতন্ত্র রক্ষার জন্য ফুঁসে উঠেছিল, তখন অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতা দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া দেশের মানুষকে রেখে কোথাও যাননি। তিনি বলেছিলেন—বাংলাদেশই আমার প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। আমরা খালেদা জিয়ার সৈনিক। তাই এই দেশই আমাদেরও প্রথম ও শেষ ঠিকানা।" তিনি আরও বলেন, "আমাদের একটাই কাজ—বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। এই দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কর্মক্ষম হাতে রূপান্তরিত করতে হবে, তাহলেই দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব।"
নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "কয়েক মাস আগে যখন নির্বাচনের প্রথম প্রচার অভিযান শুরু হয়, আমি সিলেটের পবিত্র মাটি থেকে তা শুরু করেছিলাম। সেদিন সিলেটের জনসভা মঞ্চ থেকে বলেছিলাম যে, বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, তাহলে চা-বাগানের নারী শ্রমিকদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড দেব। আজকে আল্লাহর কাছে হাজারো শুকরিয়া জানাই যে, তিনি আমাকে সেই তৌফিক দিয়েছেন এবং আমি আমার কথা রাখতে পেরেছি।" আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় সকল নারী শ্রমিকের কাছে এই ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
দেশকে এগিয়ে নিতে নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "দেশকে যদি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করতে না পারলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটির মতো পরিবার রয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে সকল পরিবারের কাছে, বিশেষ করে নারী প্রধানদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব। সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আমরা এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি।"
বক্তব্যের শেষে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নতুন স্লোগান দিয়ে বলেন, "করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ; সবার জন্য বাংলাদেশ।" বক্তব্য শেষে তিনি অনুষ্ঠানস্থলে একটি জাম ও একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা রোপণ করেন।
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মৌলভীবাজার জেলা কমিটির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম নয়ন, মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রাণালয়ের অতিরিক্তি সচিব কামাল উদ্দিন বিশ্বাস এবং ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া নারীদের মধ্যে শিউলী রানি দাস ও ওয়াজেদা বেগম বক্তব্য রাখেন।