রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রত্যেক পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে এই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোববার (৭ জুন) দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের নিজ চেম্বারে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এই তথ্য জানান আইনজীবী শিশির মনির।
তিনি বলেন, "৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রত্যেক পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সন্তানহারা পরিবারগুলোকে ইতোমধ্যে ১০ লাখ টাকা করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আগে ঘোষিত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বহাল থাকবে।"
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী শিশির মনির জানান, দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না—তা জানতে চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যে শোকজ করেছিল, তার জবাব দিতে আরও ৪৮ ঘণ্টা সময় চেয়েছে কর্তৃপক্ষ। তারা আইনজীবীকে সামনে রেখে সশরীরে হাজির হয়ে আগামী ৯ জুনের মধ্যে এই জবাব দিতে চায়।
এদিকে শোকজের জবাব দিতে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সময় বৃদ্ধির আবেদন পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
তিনি জানান, শোকজের জবাব দেওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল রোববার বিকেল ৫টা। এই সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব বা আবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের পর জবাব পাওয়া না গেলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আজকেই পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এর আগে শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে মারা যাওয়া নবজাতকদের পরিবারকে আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ ক্ষতিপূরণ, শিক্ষাসহায়তা ও চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দীর্ঘমেয়াদে থাকার এই ঘোষণা দেওয়া হয়।
পরিবারগুলো যেসব সুবিধা পাবে
আজীবন ফ্রি চিকিৎসা : ভুক্তভোগী পরিবারের বাবা, মা, ভাই-বোন ও সন্তানরা আজীবন আদ-দ্বীন হাসপাতাল ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ওষুধ ছাড়া সব ধরনের চিকিৎসা বিনা মূল্যে পাবেন।
শিক্ষাসুবিধা : আদ-দ্বীন পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা পূরণ সাপেক্ষে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ থাকছে। মেডিকেল কলেজ বা অধিক ব্যয়বহুল শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ বৃত্তি বা টিউশন ফি মওকুফের ব্যবস্থা থাকবে।
চাকরির সুযোগ : পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা অনুযায়ী আদ-দ্বীনে চাকরির সুযোগ দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে ভোরে আদ-দ্বীন হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট-অপারেটিভ (পোস্ট ডেলিভারি) ওয়ার্ডে সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) গ্যাসলাইনে লিকেজ বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শ্বাসরোধে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করে পুলিশ। ঘটনার পরপরই রমনা থানা পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
ঘটনার দিনই সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিবকে (বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা) প্রধান করে গঠিত এই কমিটিতে সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেয়া হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালককে (হাসপাতাল-১)। এছাড়া অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (আইন শাখা) এই কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেন।
এই ঘটনায় সরকারি তদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে আদ-দ্বীন হাসপাতালের দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বরতদের চরম অবহেলার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তী প্রক্রিয়া হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনে প্রধান যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে:
অক্সিজেনের ঘাটতি ও বিষাক্ত বাতাস: প্রায় ৯০০ বর্গফুটের ওই কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ ছিল। কোনো বিকল্প ভেন্টিলেশন বা আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়—যা নবজাতকদের বেঁচে থাকার জন্য অসম্ভব ছিল।
অতিরিক্ত ধারণক্ষমতা: কক্ষটিতে ১১ জন নবজাতক এবং স্বজনসহ প্রায় ৫০ জন উপস্থিত ছিলেন, যা ছিল ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি।
চিকিৎসকহীন ওয়ার্ড ও নার্সদের উদাসীনতা: সংকটাপন্ন নবজাতকদের দেখাশোনার জন্য ওয়ার্ডে কোনো চিকিৎসক ছিলেন না। নবজাতকদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্বজনরা বারবার ডাকলেও দায়িত্বরত সেবিকারা (নার্স) কোনো চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ না করে কালক্ষেপণ করেন।
জরুরি সাড়াদানের অভাব (No Emergency Response): হাসপাতালটিতে কোনো সক্রিয় 'ইমারজেন্সি মেডিকেল রেসপন্স' ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি সেবিকাদের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো কোনো প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়নি।
অনুপযুক্ত ভবন: তদন্ত কমিটির মতে, পুরো ভবনটিই হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নয়। ছোট ছোট কক্ষ নির্মাণের কারণে ভবনটি এমনিতেই যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।