প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ভূমিসেবায় দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করতে চায় সরকার। সব বিষয়ে সরকার দায়বদ্ধ থাকতে চায়। তিনি বলেন, 'সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুণা নয় বরং জনগণের সেবা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব। আমাদের লক্ষ্য একটি দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা, যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।'
মঙ্গলবার (১৯ মে) তেজগাঁও ভূমি ভবনে ৩ দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'জমি বা ভূমি শুধু একটুকরো সম্পদই নয় বরং মানুষের জীবনে এটি একধরনের নিরাপত্তা, নির্ভরতা, অর্থনৈতিক স্থিতি, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি। এই উপলব্ধি থেকেই ভূমি ব্যবস্থাপনাকে হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত করার অঙ্গীকার নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার কাজ করছে।'
তিনি বলেন, 'মালিকানা, খাজনা, দলিল, খতিয়ান, দাগ, পর্চা, নামজারি, জমা-খারিজ, মৌজা, সি-এস, আর-এস বা ডি-এস এই শব্দগুলোর সঙ্গে জমির মালিক মাত্রই কমবেশি পরিচিত। ফলে এইসব বিষয়ে নিজেদের মালিকানা হালনাগাদ রাখতে মানুষকে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে আসতে হতো। তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে ভূমি ব্যবস্থাপনাও আধুনিক হয়েছে।'
ভূমি-জমি ব্যবস্থাপনা যত বেশি আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর করা যায় জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পথও তত বেশি সহজ হয়ে যায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনলাইন সুবিধা নিশ্চিত করায় জমিজমা সংক্রান্ত দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হবে।'
তারেক রহমান বলেন, 'আজ থেকে হয়তো ১শ’ বছর আগে, যে জমির মালিক ছিলেন মাত্র একজন। সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে সেই জমির মালিক হয়তো ১শ’ কিংবা তারও বেশি। এভাবে ভূমির মালিকানা-শরিকানা যেমন বেড়েছে স্বাভাবিকভাবেই জমির মালিকানা সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়াকে রেকর্ডে রাখার জন্য ভূমি কর্মকর্তাদের দায়িত্বও তেমন বেড়েছে।'
তিনি বলেন, 'একইসঙ্গে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভূমি অফিসগুলোতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্মও কমবে। চলমান এই ভূমি মেলা আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনগণের নিজেদের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে আরো সচেতন করবে। '
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছু জমির পরিমাণও কমে আসছে। ফলে জমির অর্থনৈতিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং জটিলতাও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ ব্যক্তি ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা বর্তমানে সময়ের অপরিহার্য দাবি।'
উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করতে ভূমি মন্ত্রণালয় কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভূমি প্রশাসনের প্রায় সকল সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে নাগরিকদের জন্য সেবা গ্রহণকে আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করা হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যেখানে ভূমিসেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে আর অযথা অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না, দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না।'
দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করে জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণকে সহায়তার লক্ষে সারাদেশে ভূমিসেবা মেলা আয়োজন এবং জমি ব্যবস্থাপনাকে আরো সহজ এবং আধুনিকায়ন করার ব্যাপারে আমরা জাতীয় নির্বাচনের কয়েক বছর আগে প্রণীত ৩১ দফা এবং সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারেও উল্লেখ করেছিলাম।’
তিনি বলেন, 'আজ থেকে সারাদেশে তিন দিনব্যাপী এ ধরনের ভূমিসেবা মেলার আয়োজনের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছে দেয়া আরো একটি নির্বাচনী ইশতেহার পূরণ করেছে। '
সরকার জনগণকে দেয়া ওয়াদা পূরণের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার পর্যায়ক্রমে একের পর নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের কাছে দেয়া ওয়াদা পূরণের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'শুধুমাত্র জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়েই নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়। কারণ, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট দেশের জনগণ বর্তমানে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতগুলোতে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি সবমিলিয়ে ৪৭ লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন। এরমধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাই বেশি। সুতরাং, এ মুহূর্তে সরকারের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আদালতে বিচারাধীন মামলার দ্রুততম নিষ্পত্তি। তবে প্রচলিত আদালতের বাইরেও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত কিংবা এডিআর (বিকল্প বিবাদ নিরসনের ব্যবস্থা) অর্থাৎ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো আইনানুগ মাধ্যম অবলম্বনের দিকে আরো জোর দেয়া জরুরি। এতে একদিকে বিরোধ নিষ্পত্তিতে যেমন অল্প সময় লাগবে অপরদিকে অনেকক্ষেত্রেই বিরোধ হয়তো শত্রুতায় রূপ নেবে না।'
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উক্তির কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, 'শক্তি দিয়ে শান্তি রক্ষা করা যায় না, বোঝাপড়ার মাধ্যমেই এটি অর্জন করা সম্ভব'।
বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত মামলা বা দেওয়ানি মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে সমঝোতা বা মধ্যস্থতা, সালিশের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পথ কার্যকর করা গেলে একদিকে আদালতে বিচারাধীন মামলার জট কমবে, অপরদিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করাও সহজ হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারাদেশের সকল জেলা উপজেলায় আজ থেকে শুরু হওয়া ভূমি মেলার মাধ্যমে জনগণ নিঃসন্দেহে উপকৃত হবেন। কারণ মেলায় ই-নামজারি, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, রেকর্ড সংশোধন, খতিয়ান গ্রহণ এবং ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ নিষ্পত্তির সুবিধা থাকছে।'