শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
বিশেষ প্রতিবেদন

ভুয়া নাগরিকত্ব সনদে রোহিঙ্গা অন্তর্ভুক্তি

প্রমাণ মিলেছে, শাস্তি মেলেনি: আলীকদমের রোহিঙ্গা ভোটার কেলেঙ্কারি

বান্দরবানের আলীকদমে অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভুয়া নাগরিকত্ব সনদ ও প্রত্যয়নপত্র দিয়ে জাতীয় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলেও প্রায় এক বছরেও অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জেলা প্রশাসকের সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হলেও সেটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন এবং কয়েকজন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভুয়া নাগরিকত্ব সনদ ও ‘রোহিঙ্গা নয়’ মর্মে প্রত্যয়নপত্র প্রদান করে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পায়।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রতিবেদন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের দপ্তরে অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিরা এখনো স্বপদে দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ভুয়া জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য নথি ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে তারা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তাদের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় ফাইলটি সচিবালয়ে আটকে রাখা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম চলাকালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি সরেজমিন অনুসন্ধান, নথিপত্র যাচাই এবং সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে।

তদন্তে একাধিক রোহিঙ্গা ব্যক্তির বাংলাদেশি পরিচয়ে ভোটার হওয়ার চেষ্টার তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার, পিতার নামের স্থানে শ্বশুরের নাম উল্লেখ, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখানোসহ নথিপত্রে অসঙ্গতি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, উপস্থাপিত জাতীয়তা-সংক্রান্ত নথির তথ্য অমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং গুরুতর অসঙ্গতিপূর্ণ। স্থানীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র যাচাইয়ের ভিত্তিতে কমিটি মত দেয় যে, অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় কয়েকজন রোহিঙ্গা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

প্রতিবেদনে অভিযুক্ত হিসেবে আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য সন্তোষ কান্তি দাশ, ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মোহাম্মদ জাকের হোসেন এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল মতিনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জনপ্রতি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে ভুয়া নাগরিকত্ব সনদ ও প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিরা উত্থাপিত অভিযোগের দায় এড়াতে পারেন না।

জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদনটি ১৭ জুন ২০২৫ উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। পরে তৎকালীন জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি ২০ জুলাই ২০২৫ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন।

তবে প্রতিবেদন পাঠানোর প্রায় এক বছর পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশনা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ফাইল আটকে রাখতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর ঝুঁকি।

জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব ও ভূমি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সর্বশেষ পাওয়া সংবাদ