16 C
Dhaka
জানুয়ারী ২৪, ২০২০
Latest BD News – Corporate Sangbad | Online Bangla NewsPaper BD
জানা অজানা

সাগরে ডুবন্ত মানুষকে রক্ষা করে জেলে গিয়েছিলেন যে ক্যাপ্টেন

cap-anamur

ডেস্ক রির্পোট: ২০০৪ সালে জুন মাসে ক্যাপ আনামুর নামে জার্মানির একটি ত্রান সংস্থার একটি জাহাজ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে মিশরের সুয়েজ খালের দিকে যাচিছল। গন্তব্য ছিল ইরাক। এক দুপুরে হঠাৎ জাহাজের নাবিকরা সাগরে অস্বাভাবিক কিছু একটা দেখে ক্যাপ্টেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

ক্যাপ আনামুর নামের ঐ জাহাজের ক্যাপ্টেন স্টেফান স্মিট। ঘটনার ১৪ বছর পর সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন তিনি। আমরা দেখলাম একটি রাবারের তৈরি নৌকায় বেশ কিছু মানুষ। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম ওরা হয়তো সাগরে কোনো তেলক্ষেত্রের প্লাটফর্মের কর্মী। পরে কাছে গিয়ে দেখলাম ডুবন্ত একটি রাবারের নৌকায় ৩৭ জন বিপন্ন আফ্রিকান।

জাহাজটি কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ ছিলনা। জার্মান একটি ত্রান সংস্থার এই জাহাজটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের জন্য ত্রান সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছিল।

দেখলাম রাবারের নৌকা থেকে বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে। নৌকার লোকজন আমাদের বললো, বড়জোর ঘন্টাখানেক ভেসে থাকতে পারে তাদের নৌকা। লোকগুলোর পরনে প্যান্ট এবং টি-শার্ট। আর কিছুই ছিলনা ঐ নৌকায়। তাদের পায়ে জুতো পর্যন্ত ছিলনা। তারা জানালো, তিনদিন ধরে তারা সাগরে ভাসছে। নৌকায় খাওয়ার কোনো পানি ছিলনা। ঐ অবস্থায় পানি ছাড়া আপনি বড়জোর তিনদিন বেঁচে থাকতে পারবেন। তাদেরকে উদ্ধার করা উচিৎ কিনা – তা নিয়ে কি জাহাজের ক্রুদের মধ্যে কোনো বিতর্ক হয়েছিল?

স্মিট বললেন, সবাই একমত হয়েছিল যে ঐ লোকগুলোকে বাঁচাতে হবে। বহু পুরনো একটি আইন রয়েছে যাতে বলা আছে যে সাগরে কোনো জাহাজ যদি আরেকটি জাহাজকে ডুবতে দেখে, তাহলে অবশ্যই ঐ ডুবন্ত জাহাজের লোকজনকে উদ্ধার করতে হবে। তাদেরকে নিরাপদে নিয়ে যেতে হবে। তারা কারা, কোথা থেকে আসছিল, সেগুলো কোনো বিবেচনার বিষয় নয়।

ইউরোপে বড় ধরনের শরণার্থী সঙ্কট শুরু হওয়ার দশ বছর আগের ঘটনা এটি। তারও অনেক আগে থেকেই আফ্রিকা থেকে মানুষজন জীবন বাজি রেখে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করে আসছে। প্রধান রুট – উত্তর আফ্রিকা থেকে ইটালি। এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে বহু মানুষের সলিল সমাধি হচ্ছে।

ক্যাপ অনামুরের উদ্ধার করা ৩৭ অভিবাসীর কয়েকজন, জুন ২০০৪

পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, সাগরের যে যে জায়গায় প্রায়ই ভাসমান মৃতদেহ পাওয়া যায়, নেভিগেশন মানচিত্রে সেসব জায়গা দেখাতে মাথার খুলির ছবি দেওয়া হচ্ছে।

ক্যাপ্টেন স্মিট বলেন, মানচিত্রে মাথার খুলির ছবি দেখে জিজ্ঞেস করলে, আমাদের বলা হয়েছিল – জেলেদের সাহায্যে নেভিগেশন মানচিত্রে এই চিহ্ন বসানো হয়েছে। কারণ এসব এলাকায় জেলেদের নৌকায় প্রায়ই মৃতদেহ আটকায়।

যাই হোক, উদ্ধারকারী জাহাজ না হলেও, ক্যাপ্টেন স্মিট সেদিন ঐ ৩৭ জন আফ্রিকার অভিবাসীকে নৌকা থেকে তার জাহাজে তুললেন। তিনি চাইছিলেন, একটি নিরাপদ বন্দরে তাদের নামিয়ে দিয়ে তিনি আবার ইরাকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবেন। সবচেয়ে কাছে ছিল সিসিলি। সেদিকেই জাহাজ ঘোরালেন তিনি। আর তাতে শুরু হলো বিপত্তি। ইটালির সাগর সীমায় ঢোকার ঠিক আগের মুহুর্তে ইটালির কোস্ট গার্ডের কাছ থেকে বার্তা এলো জাহাজ যেন আর না এগোয়।

একটি জার্মানির জাহাজকে, ইউরোপীয় জাহাজকে এমন নির্দেশ দেওয়ায় আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। তবে আমি নির্দেশ মানলাম। জাহাজ থামিয়ে আমি ইটালির কর্তৃপক্ষ এবং জার্মান কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলোম, তাদের সাহায্য চাইলাম। কিন্তু কোথা থেকেও ইতিবাচক কোনো সাড়া পেলাম না।

তখনও অভিবাসন নিয়ে ইউরোপের রাজনীতিতে তোলপাড় চলছিল। ইটালি তখন অভিবাসন আইন শক্ত করতে শুরু করেছিল, এবং তারা কোনো কথা শুনতেই রাজী ছিলনা। তাদের ভয় ছিল এই ৩৭ জন আফ্রিকানকে সিসিলিতে নামতে দিলেই তারা রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবে। কিন্তু একইসাথে অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশও দায়িত্ব নিতে চাইছিল না।

আমরা মল্টাকে অনুরোধ করেছিলাম, জার্মানিকে অনুরোধ করেছিলাম এই লোকগুলোকে তারা যেন আশ্রয় দেয়। কেউই রাজী হলোনা। যেহেতু লোকগুলোতে যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সেখান থেকে ইটালি সবচেয়ে কাছে, সুতরাং আমি ইটালির ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছিলাম। ২০০৪ সালে এই খবর যখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো যে একটি ইউরোপীয় জাহাজকে ইউরোপীয় একটি বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হচ্ছেনা, সেটি বিশ্বজুড়ে বড় খবর হয়ে গেল।

ক্যাপ আনামূর ত্রান সংস্থার চেয়ারম্যান এলিয়েস পিয়েডাল তখন ঐ ত্রান জাহাজে ছিলেন। সেখান থেকে তিনি সেসময় বলেছিলেন, এই লোকগুলো মানুষ। ডুবন্ত জাহাজ থেকে আমরা তাদের উদ্ধার করেছি। এবং সবচেয়ে বড় কথা একটি ইউরোপীয় জাহাজের অধিকার রয়েছে ইউরোপীয় যে কোনো বন্দরে ভেড়ার। অভিবাসন নীতি নিয়ে ইউরোপকে নতুন করে ভাবতে হবে। ইউরোপকে দুর্গ বানানোর নীতির কারণে হাজার হাজার মানুষের সাগরে ডুবে মৃত্যু হবে – এটা হতে পারেনা।

সিসিলির বন্দরের কাছে দিনের পর দিন অপেক্ষা করে জাহাজের সবাই অস্থির হয়ে পড়েছিল। সবচেয়ে বেশি অস্থীর হয়ে পড়লো ঐ ৩৭ জন আফ্রিকান।

দশম দিনে আফ্রিকান অভিবাসীদের দুজন এতটাই অস্থির হয়ে পড়লো তারা জাহাজ থেকে সাগরে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করলো। তবে তাদের সেদিন আটকানো গিয়েছিল উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন ক্যাপ্টেন স্মিট। আমিও খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আমি ইটালির কর্তৃপক্ষকে বললাম, এভাবে আর সম্ভব হচ্ছেনা। তারা অনুমতি না দিলেও, আন্তর্জাতিক আইনের বলে আমি বন্দরে জাহাজ ভেড়াবো। পরের দিন সকালে অনুমতি মিললো।

কিন্তু জাহাজের যাত্রীদের সঙ্কট দূর হলোনা। পরিষ্কার হয়ে উঠলো যে ইটালির সরকার সাগরে অভিবাসী উদ্ধারের ইস্যুতে একটি শক্ত বার্তা দিতে বদ্ধপরিকর ছিল।

৩৭ জন আফ্রিকান অভিবাসী, যাদের অধিকাংশই ছিল গানা এবং নাইজেরিয়ার নাগরিক, তাদের একটি আটক কেন্দ্রে নেওয়া হলো এবং নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। ক্যাপ আনামূর জাহাটিকে আটক করা হলো। পাশাপাছি, ক্যাপ্টেন স্মিট, ফার্স্ট অফিসার এবং এলিয়েস পিয়েডালকে গ্রেপ্তার করা হলো। তাদের কারাগারে পাঠানো হলো।

ইটালির কর্তৃপক্ষ চাইছিল তাদের যেন ১২ বছর করে জেল হয়, একইসাথে তাদের প্রত্যেককে যেন চার লক্ষ ইউরো করে জরিমান করা হয়।

তারা জাহাজ কোম্পানীগুলোকে একটি সতর্কবার্তা দিতে চাইছিল। তবে রোমে বসে যারা কলকাঠি নাড়ছিলেন, তাদের সাথে সিসিলির কর্তৃপক্ষ যে পুরোপুলি একমত ছিলেন না তা বুঝতে পারছিলাম। পুলিশের যে সদস্যরা আমাদের কারাগারে নিয়ে যাছিল তারা মাঝপথে আমাদের আইসক্রিম খাওয়ালো। তারা আমাদের কাছে বারবার দুঃখ প্রকাশ করছিল। বলছিল, তাদের কিছু করার নেই। কারাগারেও তারা বিশেষ খাতির পেয়েছিলেন।

কারাগারের ভেতরে ওয়ার্ডেন থেকে শুরু করে কয়েদি সবাই সবাই আমাদের পক্ষে ছিলেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর একজন কয়েদি গরম কফির কাপ নিয়ে আমার বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতো।

এক সপ্তাহ পর ঐ তিনজনের জামিন হলেও, ইটালির সরকার মামলা প্রত্যাহার করলো না। জাহাজ আটকে রাখা হলো। পরের কয়েক বছর ধরে প্রায় প্রতি মাসে ক্যাপ্টেন স্মিট এবং তার দুই সহকর্মীকে সিসিলি আসতে হতো আদালতে হাজিরা দেওয়ার জন্য। ঐ যন্ত্রনা শেষ হয় ২০০৯ সালে।

আমরা শেষ দিন পর্যন্ত জানতে পারিনি কি হতে চলেছে। একদিন বিচারক হাতে একটি কাগজ নিয়ে এজলাসে ঢুকলেন এবং বললেন আমরা যা করেছিলাম তা কোনো অপরাধ ছিলনা। যে কাজ করে তাকে এই চরম বিপত্তিতে পড়তে হয়েছিল, তা নিয়ে কি তার কোনো অনুতাপ রয়েছে? না। কারণ ঐ ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ জানতে পেরেছিল ভূমধ্যসাগরে কী ঘটছে।

ক্যাপ্টেন স্মিট এখন জার্মানির শ্লেষভিগ-হোলস্টেইন প্রদেশের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনার। ঐ ঘটনার ১০ বছর পরও প্রতি বছর হাজারের ওপর মানুষ ইউরোপে আসতে গিয়ে ডুব মারা যাচ্ছে। সরকারগুলোর আপত্তি সত্বেও বেশ কয়েকটি ত্রান সংস্থা এক যোগে ভূমধ্যসাগর থেকে জীবনের ঝুকিতে পড়া অভিবাসীদের উদ্ধার করছে। এসব জাহাজকে বন্দরে ভীড়তে দেওয়া হচ্ছেনা, ক্রুদের গ্রেপ্তার করা হছে।, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এই বাধা যে আসতে চলেছে ক্যাপ আনামূরের ঘটনা ছিলা তার আগাম ইঙ্গিত। সূত্র-বিবিসি।

আরও পড়ুন:  জেনে নিন; বিরামচিহ্নের ব্যবহার সম্পর্কে

আরো খবর »

জেনে নিন; বাংলাদেশে কোন রঙ এর পাসপোর্ট কাদের জন্য?

*

চালু হলো ই-পাসপোর্ট; জেনে নিন কিছু জরুরি তথ্য

*

হলফনামা সম্পাদন করার নিয়ম জেনে নিন

*