হোম কর্পোরেট ক্রাইম টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ

টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 11:06 am
273
0
Techno

শেয়ারবাজার ডেস্ক: ওষুুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৬৭ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি উদঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ফাঁকি দেওয়া এ ভ্যাট পরিশোধে অনীহা প্রকাশেরও অভিযোগ উঠেছে।

এনবিআর বলছে, ভ্যাট পরিশোধে চূড়ান্ত দাবিনামা জারির প্রায় ১৭ মাস পরও প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট পরিশোধ করেনি বা জবাবও দেয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, যেসব ওষুধের ওপর ভ্যাট দাবি করা হচ্ছে, তা পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে সরবরাহ করা হয়। এসব ওষুধের ওপর ভ্যাট হয় না। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

Spellbit Limited

ফাঁকির বিষয়টি অস্বীকার করেন টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজালাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনার ৯০ শতাংশ ওষুধ আমরা সাপ্লাই দেয়। এসব ওষুধে ভ্যাট নেই। তাহলে আমরা ভ্যাট দেব কেন?’ তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার বলেছি ভ্যাট হবে না। কর্মকর্তারা না বুঝেই ভ্যাট দাবি করছে। আমাদের সাত বছরের ভ্যাটের কাগজপত্র নিয়ে গেছে। আমরা বলেছি কাগজপত্র ফেরত দিতে, কিন্তু ভ্যাট কর্তৃপক্ষ ২৫ শতাংশ কাগজপত্রও দিতে পারেনি।’ চূড়ান্ত দাবিনামা জারির প্রায় দুই বছর হলেও ভ্যাট পরিশোধ করেননি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভ্যাট পাইলে দিয়ে দেব। আমরা কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর তারা কোনো চিঠি দেয়নি।’

সূত্র জানায়, নরসিংদীর সাটিরপাড়া এলাকায় অবস্থিত টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ পায় এনবিআর। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠান ওষুধ বিক্রির আড়ালে বিক্রয় তথ্য গোপন করে দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরের নির্দেশে ২০১৭ সালে মূসক নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের দুটি টিম নরসিংদীর কারখানা ও সেগুনবাগিচায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালায়। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য এবং দলিলাদি জব্দ করা হয়। জব্দ দলিলাদি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের তিনটি ওষুধ কারখানায় উৎপাদনের পর গুদামজাত করা হয়। সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডিপো ও সেলস সেন্টারের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের হিসাব শাখার তথ্যানুযায়ী ডিপোতে বিক্রির আলাদা তথ্য রয়েছে; যাতে কী পরিমাণ ভ্যাট পরিশোধ করা হয় তা উল্লেখ নেই। এছাড়া ডিপোর বিক্রি হিসাব মাসিক দাখিলপত্রেও নেই।

আরও বলা হয়, তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাসিক দাখিলপত্র পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, টেকনো ড্রাগস ইউনিট-২ ও ইউনিট-৩ হতে সামান্য পরিমাণ ওষুধ ক্রয় দেখানো হয়। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট ফাঁকি দেয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানের দাখিলপত্রে প্রদর্শিত ভ্যাটযোগ্য বিক্রয়মূল্য, অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের বিক্রয়মূল্য ও পরিশোধিত ভ্যাট, মোট বিক্রয় মূল্য এবং জব্দ করা কাগজপত্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এতে দেখা যায়, কোনো কোনো মাসে প্রতিষ্ঠানটি কম্পিউটার থেকে জব্দ করা তথ্যের বিক্রয় মূল্যের চেয়ে দাখিলপত্রে প্রদর্শিত বিক্রয় মূল্য বেশি।

আবার কোনো মাসে দাখিলপত্রে প্রদর্শিত তথ্যের চেয়ে কম্পিউটারে রক্ষিত বিক্রয় মূল্য বেশি। বিষয়টি তুলনা করা হয়। প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রদর্শিত বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে কম্পিউটারে রক্ষিত বিক্রয় মূল্যের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট ফাঁকি দিতে বিক্রয় মূল্য গোপন করে আসছে।
প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন, জব্দ করা কাগজপত্র ও মাসিক দাখিলপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি তাদের উৎপাদিত ওষুধের ওপর ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩৭ কোটি ৮৫ লাখ ৪০ হাজার ৭০২ টাকার ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। ভ্যাট আইন অনুযায়ী, ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের ওপর দুই শতাংশ হারে সুদ ২৯ কোটি আট লাখ ৩১ হাজার ৬৪০ টাকা। সুদসহ মোট ফাঁকি প্রায় ৬৬ কোটি ৯৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪২ টাকা। এ ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পূর্ব) কমিশনারেটে মামলা করা হয়। ভ্যাট পূর্ব কমিশনারেট ২০১৭ সালের ৯ মার্চ টেকনো ড্রাগস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর প্রাথমিক দাবিনামা (মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৫৫(১) সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। নোটিসে ১০ দিন সময় দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রাথমিক দাবিনামা জারির পর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তিন দিন সময় বৃদ্ধির আবেদন করা হয়। কিন্তু বর্ধিত সময় পার হওয়ার প্রায় ছয় মাস পরও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। এতে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত দাবিনামা (মূল্য সংযোজন কর আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৫৫(৩) জারি করা হয়। চূড়ান্ত দাবিনামা জারির ১৭ মাস (২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত) প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট পরিশোধ বা কোনো প্রকার জবাব দেয়নি। যদিও ভ্যাট আইন অনুযায়ী, চূড়ান্ত দাবিনামা জারির তিন মাস পর ভ্যাট পরিশোধ না করলে ব্যাংক হিসাব জব্দ করে তা আদায় করা হয়। তবে ভ্যাট পরিশোধ না করলেও ভ্যাট কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের বিআইএন লক করার পাঁয়তারা করছে অভিযোগ এনে সম্প্রতি উচ্চ আদালতে রিট করেছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে মূসক নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল ৪০ লাখ সাত হাজার ৮৯৪ টাকার ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে আরও একটি মামলা করে। প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত ও অবৈধ রেয়াত গ্রহণ, বিভিন্ন সেবার ওপর উৎসে ভ্যাট, ভাড়ার ওপর ভ্যাট ও বিক্রয়মূল্য গোপন করে এ ভ্যাট ফাঁকি দেয়।

এ বিষয়ে ভ্যাট পূর্ব কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা বলেন, চূড়ান্ত দাবিনামা জারির ১৭ মাস পরও ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এমনকি আপিলও করেনি। এতে বুঝা যায় প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট পরিশোধে অনীহা রয়েছে। ভ্যাট পরিশোধ না করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে উৎপাদন শুরু করা টেকনো ড্রাগস লিমিটেড বর্তমানে ৫০টির বেশি ওষুধ উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানটি ওষুধ রফতানি করে। সূত্র: শেয়ার বিজ

আরও পড়ুন: ওজন ও পরিমাপে কারচুপির অপরাধে ১৪ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিএসটিআই‘র মামলা