হোম কর্পোরেট সুশাসন চেয়ারম্যানের কিডনীতে অস্ত্রপ্রচার, অনিশ্চিয়তায় ডেসটিনির ডেসটিনেশন!

চেয়ারম্যানের কিডনীতে অস্ত্রপ্রচার, অনিশ্চিয়তায় ডেসটিনির ডেসটিনেশন!

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 7:24 pm
612
0

মাহমুদ: ডেসটিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনের কিডনীতে জটিল অস্ত্রপ্রচার করা হয়েছে। জানা গেছে, গত মাসের শেষ সপ্তাহে আদালতে হাজিরা শেষে কাশিমপুর কারাগারে ফেরত যাওয়ার পর তাঁর প্রশ্রাবে ইনফেকশন দেখা দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে দ্রুত গাজীপুর হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করেন। সেখানে এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণে রাখার পর চিকিৎসক অপারেশনের মাধ্যমে তাঁর কিডনী থেকে পাথর অপসারণ করেন। কিন্তু অপারেশন পরবর্তী সময়ে তাঁর নানা ধরণের স্বাস্থ্য জটিলতার কারণে প্রায় সাতদিন পোস্ট অপারেটিভে রাখা হয়। যেখানে সাধারণত রোগীদের ১২ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ ঘন্টা রাখা হয়। বর্তমানে তাঁর অবস্থা ঝুঁকিমুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। মোহাম্মদ হোসেনের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে ১১ অক্টোবর জেলে যাওয়ার পর থেকে তিনি নানা ধরনের জটিল অসুখে আক্রান্ত হয়েছেন।

এদিকে গত বছরের ৩ ডিসেম্বর ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন আদালত থেকে ফেরার পর হঠাৎ করে সন্ধ্যার দিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল হয়ে তাঁকে ইব্রাহিম কার্ডিয়ার্কে ভতি করা হয় এবং সেখানে তাঁর হার্টে ২টি রিং বসানো হয়। তিনি বর্তমানে হৃদরোগ সহ নানা ধরনের অসুখে ভুগছেন। তাঁর পরিবারও জানিয়েছেন, কারাবন্দি হওয়ার পর তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে এবং জটিল সব রোগে আক্রান্ত হতে থাকেন।

Spellbit Limited

এতদিন কারাবন্দি ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনের চিকিৎসা ব্যয় বহন করেছেন ডেসটিনির ৪৫ লক্ষ ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারী সদস্যরা। তাঁদের প্রদেয় টাকায় চলতো কারাবন্দিদের চিকিৎসা ব্যয় ও মামলা সহ অন্যান্য খরচ। ব্যবসা চালু না হওয়ায় বর্তমানে তারাও পড়েছে চরম আর্থিক সংকটে। সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করার পর সহায় সম্বল যা ছিল তাও বিক্রি করে তাঁদের পিছনে ব্যয় করেছে। বর্তমানে তাঁরা নিজেরাই যেখানে মানবেতর জীবন যাপন করছেন সেখানে আর তাদের পক্ষে ডেসটিনির এমডি ও চেয়ারম্যানে পিছনে অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ডেসটিনির এমডি ও চেয়ারম্যানের চিকিৎসাও পড়ছে হুমকির মুখে।

২০১২ সালের ১১ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজধানী ঢাকার কলাবাগান থানায় দায়েরকৃত মানি লন্ডারিং মামলায় জেলে যান ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন। এদিন তারা জামিন আবেদন করলে আদালত জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান। সেই থেকে তাঁরা জেলে আছেন এবং বন্ধ আছে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড সহ সকল কোম্পানির কার্যক্রম। বেকার হয়ে পড়েন ৪৫ লক্ষ ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারী সদস্য এবং প্রায় পাঁচ হাজার কর্মকর্তা, কর্মচারী।

বন্ধ কোম্পানির কিছু শেয়ারহোল্ডার গত বছর ৮ এপ্রিল আদালতে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করার অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন। যার পিটিশন নম্বর কোম্পানি মেটার-১৩৪। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে রুল জারি করেন আরজেএসসি’র বিরুদ্ধে। কিন্তু পরবর্তীতে আদালত কোম্পানির এজিএমের অনুমতি না দিয়ে কেন কোম্পানিটির অবসায়ন হবে না তা জানতে চেয়ে মামলার আবেদনকারীদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেন। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আপিলে গড়ায়। এখন তারা অপেক্ষায় আছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল আদালত বিষয়টি কীভাবে নেন।

এদিকে মামলায় মানি লন্ডারিং প্রমাণিত হলে এসিসি এর ২০০৯ আইনে সর্বোচ্চ সাত এবং ২০১২ সালের আইনে বার বছরের সাজার বিধান রয়েছে। জেল কোড অনুযায়ি দশ মাসে বছর হলে ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ি সাজার মেয়াদ হয় পাঁচ বছর দশ মাস। অন্যদিকে ২০১২ সালের আইন অনুযায়ি সাজার মেয়াদ হয় দশ বছর। ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে জেলে আছেন। সে হিসাবে তাঁরা জেলে আছেন ছয় বছর পাঁচ মাস।

২০১৬ সালের ২০ জুলাই ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও ডেসটিনি-২০০০ লিঃ এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন হাইকোর্ট থেকে তাঁদের পাসপোর্ট আদালতে জমার রাখার শর্তে জামিন আদেশ পেয়েছিলেন। কিন্তু জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুদক আপীল করলে তাঁদের মুক্তির বিষয়টি আটকে যায়। একই বছরের ১৯ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপীলেড ডিভিশন নতুন কিছু শর্ত সাপেক্ষে ডেসটিনির শীর্ষব্যক্তিদের জামিনে মুক্তির আদেশ বহাল রাখেন। আদেশে শর্ত দেয়া হয় যে, ছয় সপ্তাহের মধ্যে গাছ বিক্রি করে দুই হাজার আটশত কোটি টাকা দুদকের কাছে জমা দিতে হবে। কিন্তু শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়ে ডেসটিনি কর্তৃপক্ষ আপিল বিভাগে মামলার রায় রিভিউয়ের জন্য আবেদন করে, যা গত ৩০ নভেম্বর ২০১৭ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্জ তা খারিজ করে দেন।

দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষারত ডেসটিনির ৪৫ লক্ষ ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারী সদস্যরা অনেকটাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। মামলার গতি প্রকৃতি দেখে অনেকেই ধারণা পোষণ করছেন যে, হয়ত খুব সহসাই এর নিষ্পত্তি হবে না। সম্প্রতি বিচারিক আদালত পরিবর্তন হওয়ায় বিষয়টি এখন আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়। আদালত সূত্রে জানা গেছে, বিচারিক আদালতে চলতি মাসের ১৮ তারিখের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির আদেশ ছিল উচ্চ আদালতের। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি হবে না মর্মে নিশ্চিত হয়ে বিশেষ জজ আদালত-৫ মামলাটি ছেড়ে দেন। ফলে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় মামলার ভবিষ্যত নিয়ে। পরবর্তীতে বিশেষ জজ আদালত-৪ এ মামলাটি স্থানান্তর করা হয়, যেটি এখন বিচারাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী এ্যাড. আবদুস ছালামের সাথে কথা হয়। তিনি জানান, মামলা নিষ্পত্তি কবে হবে এটা বলা মুশকিল। তবে চলতি মাসের ১৮ তারিখের মধ্যে যে কিছুই হচ্ছে না, এটা নিশ্চিত।

ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারী সদস্যদরা বলছেন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে কার লাভ হলো বুঝলাম না। আদালত কর্তৃক ডেসটিনি’র সকল সম্পত্তি জব্দ করলো অথচ এখন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সকল সম্পত্তি বেহাল অবস্থায় রয়েছে, অনেক সম্পত্তি আবার বেহাতও হয়ে যাচ্ছে। কালক্ষেপণ না করে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে ডেসটিনির কর্ণধারদের মুক্তি এবং কোম্পানির কার্যক্রম চালু করার বিষয়ে একটা কার্যকরি সিদ্ধান্ত দাবি করেন তাঁরা। যাতে করে ডেসটিনি গ্রুপের সকল প্রতিষ্ঠানে কর্মচঞ্চলতা ফিরে আসে ঠিক আগের মত। কর্পোরেট বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মামলার আসামীরা দোষী প্রমাণিত হলে আদালত যা ভাল বোঝেন, তাই করবেন। কিন্তু ডেসটিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দোষ কী? প্রতিষ্ঠানতো কোনো অপরাধ করেনি। বর্তমানে চালু ডেসটিনির একমাত্র প্রতিষ্ঠান বৈশাখী মিডিয়া লিমিটেড। অন্যসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে গত ৭ বছর ধরে। এভাবে বন্ধ থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠানই আর এক সময় বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যাবে না-এমনটাই ধারণা কর্পোরেট ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বোদ্ধাদের।

আরও পড়ুন: প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করা জরুরি মোবাইল ব্যাংকিং