হোম আর্কাইভ ব্যাংক খাতে সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা নতুন সরকারের কাছে!

ব্যাংক খাতে সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা নতুন সরকারের কাছে!

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 8:35 pm
302
0
Compliance audit

মিজানুর রহমান: দেশের ব্যাংকিং খাত ভয়াবহ সংকটের মুখে আছে। একদিকে এই খাত থেকে লুটপাট হয়ে গেছে ২২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে ভয়াবহ ভাবে। ফলে ব্যাংকগুলো চরম সংকটে পড়েছে। দেখা দিয়েছে মূলধন ঘাটতি। বিগত কয়েক বছর ধরে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রেখে মূলধন সরবরাহ করে ব্যাংককে সংকট থেকে উদ্ধার করছে সরকার। কিন্তু এত সংকটের মধ্যেও ২০১৮ সালে সরকারি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো উচ্চ হারে পরিচালন মুনাফা করেছে। এটা একটা রহস্যজনক ব্যাপার। তবে অনুসন্ধান করলে জানা যাবে ব্যাংকগুলো এই উচ্চ হারে মুনাফা করেছে মূলত সাধারণ গ্রাহকদের ঠকিয়ে। দু’ এক দিনের মধ্যেই নতুন সরকার গঠিত হবে। মাননীয় অর্থ মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ইতিমধ্যে রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। অথবা নতুন কেউ হতে পারে অর্থমন্ত্রী, যিনিই মন্ত্রী হন, তার কাছে অনুরোধ ব্যাংকিংখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

ব্যাংক খাতে নানা কেলেঙ্কারির প্রকাশ হওয়ার বছর ছিল ২০১৮ সাল। তবে সারা বছর রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত থাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর তেমন চাপ সৃষ্টি হয়নি। বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ, মূলধন সংকট, নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে ব্যর্থ হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে ব্যাংক খাতে। তারপরও বছর শেষে অধিকাংশ ব্যাংকেরই পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। কিন্তু নিট মুনাফা বাড়বে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর সঙ্গে হুহু করে বাড়ছে খেলাপি ঋণ, যা শুভ লক্ষণ নয়। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন বছরে গঠিত হতে যাওয়া সরকার উদ্যোগ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। পরিচালন মুনাফা বৃদ্ধির কাতারে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, পূবালী, ডাচ্-বাংলা, এক্সিম, ঢাকা, সাউথইস্ট, ইস্টার্ন, ব্যাংক এশিয়া, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি), প্রিমিয়ার, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, শাহ্জালাল ইসলামী, মার্কেন্টাইল ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। অপরদিকে পরিচালন মুনাফা কমিয়ে যাওয়ার তালিকায় রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও মেঘনা ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে এবার লোকসান দিয়েছে বেসিক ব্যাংক।

Spellbit Limited

এ কথা সত্য যে, পরিচালন মুনাফা অর্জনই ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। প্রতি বছর ব্যাংকের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, যেখানে চূড়ান্ত হিসাব তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ব্যাংকের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ শেষে এবং করের টাকা পরিশোধের পর প্রকৃত মুনাফার চিত্র পাওয়া যাবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং খাতের যে নেতিবাচক ঘটনার খবর উঠে আসছে, তার মধ্যে পরিচালন মুনাফার একটি ভালো সংবাদ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবসা একটা লাভজনক ব্যবসা। এমনকি বিভিন্ন বাহিনীও ব্যাংক চায়। ব্যাংক হতে হতে ৬০ টি হয়ে গেছে। এই সংখ্যা প্রতিবেশি বিরাট দেশ ভারতের থেকে বেশি। অর্থনীতিবিদরা এমন কি মাননীয় অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত বলেছেন দেশে ব্যাংক বেশি হয়ে গেছে। ব্যাংকের প্রতি উদ্যেক্তাদের এত আগ্রহ কেন? খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, ব্যাংকে মুনাফা অনেক এবং এখান থেকে জনগণের টাকা নিয়ে অনিয়ম করা যায়। সরকার ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেয় এবং সে কারণে ব্যংককে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়। কিন্তু ব্যাংকগুলো সুযোগ নিয়ে আমানতের সুদহার কমিয়ে দেয় কিন্ত ঋণের সুদহার সেইভাবে কমায় না। ফলে মুনাফা বাড়ে কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ আমানতকারীরা। মুনাফা করার জন্যই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়, কিন্তু সেই মুনাফা হতে হবে যৌক্তিকভাবে। জনগণকে ঠকিয়ে উচ্চ হারে পরিচালন মুনাফা অর্জন মোটেই কাম্য নয়।

ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্রের অবস্থা ভালো দেখানোর জন্য পরিচালন মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর একটা প্রবণতা আছে। এসব ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতির ওপর দেশের বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনেকাংশেই নির্ভরশীল। ঋণ খেলাপির কারণে ব্যাংক পরিচালনায় অনেক সমস্যা হচ্ছে বলেও জানা যায়। বর্তমান সরকারের অনেক সাফল্যের পরও ব্যাংক খাত নিয়ে ছিল বড় রকমের সমালোচনা। দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে অভাবনীয় সাফল্যও ব্যাংক খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে ভালো বার্তা দিতে পারেনি। তাই নতুন ভাবে গঠিত হতে যাওয়া সরকারকে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই নতুন সরকারকে এ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নতুন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব হবে ব্যাংকিং খাতের দিকে প্রথমেই নজর দেয়া। স্প্রেড কমাতে হবে যাতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হন। খেলাপি ঋণ কমাতে হবে তার জন্য কঠোর আইন করতে হবে। ব্যাংক লুটেরাদের ধরে ধরে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

লেখক: আইসিএসবি’র ফেলো, সম্পাদক, কর্পোরেট সংবাদ ও কলামিষ্ট।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানালেন সোনিয়া গান্ধী