হোম কর্পোরেট সুশাসন শঙ্কায় ডেসটিনি’র এমডি, প্রয়োজন তার জামিন বা প্যারোলে মুক্তি

শঙ্কায় ডেসটিনি’র এমডি, প্রয়োজন তার জামিন বা প্যারোলে মুক্তি

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 9:36 pm
2383
0

মিজানুর রহমান: ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর থেকে কারাবন্দি আছেন ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন। রাজধানী ঢাকার কলাবাগান থানায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক দায়েরকৃত মানি লন্ডারিং মামলায় আদালতে আত্মসমর্পন করে জামিন চাইলে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ করেন। সেই থেকে কারান্তরীণ আছেন তিনি।

ছয় বছরের অধিককাল ধরে কারাবাসের ফলে রফিকুল আমীনের শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রকম রোগ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনী সহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্রায়ই বারডেম হাসপাতালে যেতে হয়। যদিও বিভিন্ন রোগ ও স্বাস্থ্যগত জটিলতা নিয়ে নিজেও ছিলেন চিন্তিত। সুচিকিৎসার অভাবে সর্বশেষ গত ৩ ডিসেম্বর ঢাকার একটি আদালতে হাজিরা শেষে কারাগারে ফেরার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। কারা কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেন। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হলে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে খুব দ্রুত তাকে বারডেমে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাঁর এনজিওগ্রাম করার পর হার্টে রিং বসানো হয়। তার পর থেকে হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয় তাকে। আজ ১১ ডিসেম্বর তার অবস্থা আবারো খারাপের দিকে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আবার দ্বিতীয় দফা রফিকুল আমীনের হার্টে আরেকটি রিং বসান। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রফিকুল আমীনের শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভাল কিন্তু পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে যে কোনো সময় দেশের বাইরে নেওয়া লাগতে পারে।

Spellbit Limited

বারডেম হাসাপাতালের অধ্যাপক ডাঃ সাইদুর রহমানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে তার। জানা গেছে কারা কর্তৃপক্ষ সাথে সাথে যদি ঢাকা মেডিকেলে না পাঠাতেন এবং ঢাকা মেডিকেল কর্তৃপক্ষ যদি তাৎক্ষণিকভাবে বারডেমে পাঠানোর ব্যবস্থা না নিত তাহলে অবস্থা হয়তো আরো খারাপ হতে পারতো। একজন মুমূর্ষ আসামি ও রোগিকে বাঁচানোর জন্য কারা কর্তৃপক্ষ, ঢাকা মেডিকেল ও বারডেমের চিকিৎসকেরা যেভাবে দ্রুততার সাথে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়েছে তা অবিস্মরণীয়। ডেসটিনি’র এমডি’র জীবন বাঁচানোর জন্য এবং ডেসটিনি সংশ্লিষ্ট সকলের তথা সারা দেশে বেকারত্ব দূর করার জন্য এখন সরকারের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন রফিকুল আমীনের জামিন বা প্যারোলে মুক্তি এবং কেবল তখনই হতে পারে একজন মানুষের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের মুক্তি এবং আবারও চালু হতে পারে কর্মচঞ্চলতা, যারা বেকার হয়েছেন তারা ফিরে পাবেন কাজ।

এদিকে রফিকুল আমীনের কারাগারে যাওয়ার পর থেকে ডেসটিনির ৪৫ লক্ষ ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারী সদস্য তাঁদের পুঁজি আটকে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আদালতের উদ্যোগে কেউ কেউ আশ্বান্বিত হলেও তাঁদের চোখে মুখে এখন অনিশ্চয়তার ছাপ। অনেকেই ভেবেছিল, হয়তো আদালতের মাধ্যমে তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাবেন। কিন্তু সেই ভাবনা এখন ম্লান হতে বসেছে। কারণ ইতোপূর্বে দেয়া আদালতের শর্তযুক্ত রায় বাস্তবায়ন কোনভাবেই সম্ভব হয়নি। শর্ত সাপেক্ষে মুক্তির আদেশও আটকে গেছে আইনী জটিলতায়। আর এই জটিলতার মধ্যে রফিকুল আমিনের জীবনটাই পড়ে গেছে জীবন-মৃত্যুর সন্দিক্ষণে।

কারাবাসের পর থেকে তাঁর চিকিৎসা ও আইনী খরচ সহ সবকিছু বহন করছেন ডেসটিনির ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারী সদস্যরা। প্রতিটি সদস্যের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনি। ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালিকের বর্তমান শারীরিক অবস্থায় অনেকটাই শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সকল ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারী সদস্যরা। তাঁরা এখন রফিকুল আমীনের সুচিকিৎসার জন্য কারামুক্তি চান। তাদের বিশ্বাস, আদালত নয়, বরং রফিকুল আমিন সুস্থ হয়ে ফিরে এলেই তাদের বিনিয়োগ ফিরে পাবেন, শুরু হবে কর্মময় জীবন।

দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ি মানি লন্ডারিং মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা হয় সাত বছর। সেখানে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে জামিনযোগ্য মামলায় বিনাবিচারে কারাগারে আছেন ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন। অতি সম্প্রতি মানব বন্ধনের মাধ্যমে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন সকল বিনিয়োগকারীরা। তাঁরা বাস্তবায়নযোগ্য যেকোন শর্তের ভিত্তিতে রফিকুল আমিনের মুক্তি চাচ্ছেন।

২০১৬ সালের ২০ জুলাই দুদকের মানি লন্ডারিং মামলায় মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন হাইকোর্ট থেকে তাদের পাসপোর্ট আদালতে জমা রাখার শর্তে জামিন আদেশ পেয়েছিলেন। কিন্তু জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুদক আপীল করলে তাঁদের মুক্তির বিষয়টি আটকে যায়। পরবর্তীতে একই বছরের নভেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্টের আপীলেড ডিভিশন নতুন কিছু শর্ত সাপেক্ষে ডেসটিনির শীর্ষব্যক্তিদের জামিনে মুক্তির আদেশ বহাল রাখলেও নতুন করে আইনী জটিলতায় আটকে যায় তাঁদের কারামুক্তি।

এদিকে ২০১২ সালের পর থেকে রফিকুল আমীন ও মোহাম্মদ হোসেনের কারাবরণ এবং একের পর এক মামলার কারণে কর্মচঞ্চল সেই অফিসে এখন সুনশান নীরবতা। বেকার হয়ে পড়েছেন পাঁচ সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারি। অসহনীয় যন্ত্রণায় মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা।

এসবকিছু মানবিক বিবেচনায় রফিকুল আমীনের কারামুক্তি অসম্ভব নয়। একজন মানুষের জীবন রক্ষার্থে, সুচিকিৎসার স্বার্থে আইনী কাঠামোর মধ্যেই রফিকুল আমিনকে জামিন দেওয়া সম্ভব। এবং আমাদের দেশে এ ধরনের নজির অনেক রয়েছে।

ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন যদি জামিনে মুক্ত হয়ে সুচিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ৪৫ লক্ষ ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারীর অর্থ ফিরিয়ে দিতে পারেন, সেক্ষেত্রে দেশের জনগণের একটি বৃহৎ অংশের স্বার্থ সুরক্ষা করা হবে। মানবেতর জীবনযাপনকারী সদস্যরা ফিরে পাবেন কর্মচঞ্চলতা যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। আর এই বিষয়টিকে সরকার এবং আদালত সহানুভূতিশীল দৃষ্টি নিয়ে রফিকুল আমীনকে জামিন দিতে পারেন বা প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন এবং সেই সাথে জীবিকান্নেষনে সহযোগিতা করতে পারেন ডেসটিনি সংশ্লিষ্ট লক্ষ লক্ষ মানুষের।

লেখক: আইসিএসবি’র ফেলো, সম্পাদক, কর্পোরেট সংবাদ ও কলামিষ্ট।

আরো পড়ুন: নির্বাচনের আগে পুণ:তফসিল, ঋণ খেলাপী বন্ধে কতটা কার্যকর?
পলিসি ঝরে গেলেও টিকে আছে বিমা কোম্পানি