Home কর্পোরেট সুশাসন নাসিরনগরে হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই

নাসিরনগরে হামলায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই

Published: 2016.12.06
234
0
SHARE


আহমদ রফিক: ভারতীয় বঙ্গদেশ থেকে বর্তমানে বিভক্ত দুই বাংলায় হিন্দু-মুসলমানভিত্তিক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির ইতিহাস বড় বিচিত্র। সুলতানি আমলের বাংলা থেকে মোগল শাসনে বাবর থেকে শাহজাহান পর্যন্ত বঙ্গে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে লক্ষণীয় বিষয় ছিল উভয় সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ছোটখাটো বিরোধ ধর্তব্যের মধ্যে নয় এ কারণে যে প্রবচনমতে ‘হাতের পাঁচ আঙুল সমান হয় না’, আর এক পরিবারেও ভাইয়ে-ভাইয়ে বিবাদের বাস্তবতা প্রবাদের অংশ। এসবই সহজাত মনের প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবোধ তাতে জ্বালানি বা ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে, এই যা।

এ সম্পর্কে বাংলাদেশি লেখকদের মধ্যে উদারপন্থী বা যুক্তিবাদী বা ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের মধ্যে বহুল দৃষ্ট প্রবণতা হলো, উল্লিখিত সম্প্রীতির বিনাশ সম্পর্কে ইংরেজ আমলে অনুসৃত সাম্প্রদায়িক ভেদনীতির ওপর হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কে অবনতির সব দায় অন্ধভাবে চাপিয়ে দুই সম্প্রদায়কে সাফসুতরো করে তোলার চেষ্টা। অর্থাৎ আত্মসমালোচনার বিচার-ব্যাখ্যায় না গিয়ে এ ক্ষেত্রে উভয় সম্প্রদায়ের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করা। যুক্তি ও তথ্য এতে সায় দেয় না।

এ বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে শাসক হিসেবে ইংরেজ ধোয়া তুলসীপাতা। বলা বাহুল্য, ইংরেজ শাসনের অন্যতম প্রধান নীতি ছিল হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ-বিরূপতা জাগিয়ে রাখা। ভারতের ইংরেজ গভর্নর জেনারেল, ভাইসরয়দের শাসনসংক্রান্ত গোপন চিঠিও এ বিষয়ে ভেদনীতির প্রমাণ দেয়। এ নীতির নিহিত প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারতে ইংরেজ শাসন দীর্ঘস্থায়ী ও নির্বিঘ্ন করা, সিপাহি বিদ্রোহে দৃষ্ট হিন্দু-মুসলমান ঐক্যে ভাঙন ধরানো এবং তাদের পরস্পরকে বিপরীতমুখী করে তোলা। তা সত্ত্বেও দেখা যায়, ইংরেজ আমলের অখণ্ড বঙ্গে হিন্দু-মুসলমান সহিংসতা তথা রক্তাক্ত দাঙ্গা ঘটেছে বিশেষভাবে গত শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে এবং এর ভয়াবহ ও সর্বাধিক প্রকাশ ১৯৪০ সালে দ্বিজাতিত্ত্বভিত্তিক সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রচারের সময় থেকে। এর পেছনে সম্প্রদায়বাদী রাজনীতি প্রধান কারণ। এর আগের দাঙ্গাগুলোয় ধর্মীয় কারণ প্রাধান্য পেয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে হিন্দুত্ববাদীদের গোরক্ষা ও ধর্মীয় আধিপত্যবাদী আন্দোলন, শুদ্ধিকরণ ইত্যাদি। আর মুসলমান তরফে ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের লক্ষ্যে ওয়াহাবি-ফারায়েজি আন্দোলন ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন, যা প্রধানত পূর্ব বঙ্গে হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থেকে মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনায় বিচ্ছিন্ন করা। কাজটা ভালোভাবে সম্পন্ন হয়।

এর মধ্যে একটি অপ্রিয় সত্য হলো, ইংরেজ আমলের উল্লিখিত ভেদনীতি সত্ত্বেও রাজধানী ও বড় দু-চারটি শহর বাদে গোটা বঙ্গদেশকে দেখা গেছে শান্ত। বিশেষ করে দু-একটি এলাকা বাদে গোটা গ্রামাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ আবহ। উদাহরণ টানতে গেলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে হয়, আজ যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর অশান্ত তার পাশে বড়সড় আয়তনের নবীনগর থানার গ্রাম এলাকায় কখনো দাঙ্গার একটি স্ফুলিঙ্গপাত দেখা যায়নি, কী ইংরেজ আমলে, কী সহিংস পাকিস্তান আমলে; এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে। নড়াইল, মুন্সীগঞ্জসহ একাধিক মহকুমার কথা জানি, শহর বা গ্রামে কখনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখা যায়নি। আসলে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা মূলত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ এই দুই ধারার প্রভাবে জন্ম নিতে দেখা গেছে। যেখানে সামাজিক সুস্বাস্থ্য প্রবল সেখানে উসকানি সত্ত্বেও তা প্রতিহত হয়। দূষিত রাজনীতি ও সমাজে প্রতাপশালীদের লোভ-লালসা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের টানে অলীক বা বাস্তব ঘটনা বা রটনা উপলক্ষে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানো হয়। আগেই বলেছি, জমি-বাস্তুভিটা ও বাণিজ্যিক সম্পদ দখলের প্রবল আকাক্সক্ষাই নেপথ্য সত্য।

দুই.
বাংলাদেশে দূষিত রাজনীতির প্রভাবে ও ন্যায়ভিত্তিক সুশাসনের অভাবে পূর্বোক্ত স্বার্থবাদী কারণে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামার প্রকাশ। এ ক্ষেত্রে সামাজিক কারণও যথেষ্ট শক্তিশালী। যেমন রক্ষণশীলতা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতা ইত্যাদি। পাকিস্তানি আমলের সূচনালগ্ন থেকে উগ্র ধর্মীয় বিদ্বেষ ছিল সামাজিক ব্যাধির মতো বিষয়। তাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ইন্ধন ছিল পরিকল্পিত। পাকিস্তানি শাসকদের নীতি ও লক্ষ্য ছিল পূর্ববাংলা থেকে সংখ্যালঘুদের বিতাড়িত করে জনসংখ্যা বিচারে পশ্চিম পাকিস্তানকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করে তোলা। এ নীতি তারা একাত্তরে সরাসরি প্রকাশ করেছে। বিদেশি পত্রিকার একাধিক প্রতিবেদন থেকে তা জানা গেছে। ফলে অবিভক্ত বঙ্গের পূর্ববাংলায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যেখানে ছিল ৩০ শতাংশ, পাকিস্তান আমলে তা কমে ২২ শতাংশে নেমে আসে।

তবে অবিশ্বাস্য ঘটনা হলো, একাত্তরে সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সংঘটিত স্বাধীনতাযুদ্ধের ফলে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের একটি সেক্যুলার সংবিধান প্রণয়ন সত্ত্বেও রাজনৈতিক-সামাজিক অঙ্গন থেকে সাম্প্রদায়িক চেতনার অবসান ঘটেনি। প্রমাণ বহু ঘটনা। যেমন ছোট-বড় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, কারণে-অকারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় অনেক সংখ্যালঘুর দেশত্যাগ সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে আসে পরিত্যক্ত বাস্তুভিটা, জমি-সম্পত্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

থেকে থেকে ছোট ছোট এলাকায় সাম্প্রদায়িক হামলার কারণে সংখ্যালঘু সদস্যদের দেশত্যাগ নিয়তির মতো অবধারিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকে রাউজান-পটিয়া হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহের গারো অঞ্চল বা মধুপুর হয়ে যশোর, ফরিদপুর, খুলনায় সামাজিক সহিংসতার চাপে হিন্দু জনগোষ্ঠীর লাগাতার স্বদেশ ত্যাগের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এই হলো সেক্যুলার বাংলাদেশের সামাজিক পরিস্থিতি।

অন্যদিকে বাহাত্তরের সংবিধানের সেক্যুলার চরিত্রও স্থায়ী হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সংবিধানের গণতান্ত্রিক চরিত্র হনন ঘটে দুই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কল্যাণে। সংবিধানের ইসলামী চরিত্র নিশ্চিত করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতার মূলে কুঠার চালিয়ে একের পর এক পরিবর্তন, সবশেষে সংবিধানে যুক্ত হয় রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। অমুসলিম জনতা তাত্ত্বিক বিচারে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত।

সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও সমাজে গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটেনি। ব্যক্তি মানসিকতা পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হতে পারেনি। সমাজে এমন এক অবস্থার কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠের হামলার অবসান ঘটেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ও ঘাতক যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুখ চাঁদে দেখা গেছে—এমন এক উদ্ভট প্রচারে উন্মত্ত জনতার হামলা হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর, যাদের সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই।

এই যে একের পর এক ঘটনা—এর প্রকাশ বন্ধ হচ্ছে না এর বড় কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীর শাস্তি হচ্ছে না—যেমন রামু, পটিয়া, কক্সবাজার হামলায় অপরাধীদের বিচারের আওতায়ই আনা হয়নি, বিচার তো দূরের কথা। তেমনি সাতকানিয়ার মতো বহু ঘটনায় অপরাধীদের বিচার ঝুলে আছে দীর্ঘ সময় ধরে। এসব দৃষ্টান্ত হামলাকারী দুর্বৃত্তদের উৎসাহিত করে।

তিন.
সামাজিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশে মাঝেমধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিস্ফোরণ ঘটতে দেখা যায়। কখনো ছোট, কখনো বড় আকারে। এর জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের দায় কম নয়। মাগুরা হামলার বিচার হয়েছে কি? কিংবা এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সহিংসতার যথাযথ তদন্ত ও বিচার? না, হয়নি। প্রায়ই দেখা যায় পূজার সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশ, কখনো মন্দিরে হামলা। এসব ক্ষেত্রে অপরাধীরা কি শাস্তি পায়? আমরা এমনই ন্যায়নীতির ধ্বজাধারী!
সম্প্রতি নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে ব্যাপক হামলা ও সহিংসতা—অর্থাৎ ভাঙচুর, আগুন ও লুটপাট রামুর হিন্দু-বৌদ্ধপল্লীতে হামলারই প্রতিরূপ। হামলাকারীরা চরিত্র বিচারে একই গোত্রের। কয়েক দিন ধরে এ ঘটনা নিয়ে সমাজের সচেতন অংশ উত্তাল—তারা বিচারের দাবিতে মানববন্ধন, সমাবেশ ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে।

সংবাদপত্রগুলো তাদের পেশাগত ও সামাজিক-নৈতিক দায়িত্ব পালন করে চলেছে কিন্তু হলে কী হবে? কথিত অসাম্প্রদায়িকতার আবরণে যখন সাম্প্রদায়িকতার ভূত লুকিয়ে থাকে তখন কী মৃত্যুদণ্ড, কী সুবিচার—কোনোটাই মেলে না। মেলেনি রামু হামলায়, মেলেনি একাধিক সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায়। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের দুর্বৃত্ত ও তাদের নেপথ্য নায়করা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। আর ওই নেপথ্য নায়করা ক্ষমতাসীন দলের হলে তো কথাই নেই।

তাই নাসিরনগরের ঘটনার নির্বিবাদ বিস্তার ঘটেছে দেশের একাধিক স্থানে। এবং এক সপ্তাহজুড়ে তা অব্যাহত। এর দায় কি নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশাসন ও মাঠ কর্মকর্তাদের ওপর পড়ে না? নাসিরনগর ঘটনার বৈশিষ্ট্য রামু ঘটনা থেকে কিছু ভিন্ন এদিক থেকে যে এখানে স্থানীয় উৎসাহে কথিত বহিরাগতদের হামলায় পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, এমনকি সংসদীয় প্রতিনিধি জড়িত বলে সংবাদপত্র প্রতিবেদনে প্রকাশ। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এ ক্ষেত্রে অমার্জনীয় অপরাধ।

এ সম্পর্কে প্রফেসর জাফর ইকবাল তাঁর উপসম্পাদকীয় নিবন্ধের শিরোনাম দিয়েছেন, ‘নাসিরনগর : দ্বিতীয় রামু?’ আসলে এ ঘটনা চরিত্র বিচারে রামুর চেয়ে গুরুতর। এর বিস্তার ও প্রভাবও তুলনায় অনেক বেশি। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে নাসিরনগর ও জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাইরে একাধিক এলাকায়। পাকিস্তান আমলের বৈশিষ্ট্য এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক উপস্থিত। পাকিস্তান আমলে পুলিশ ও প্রশাসন হামলা চলাকালে ও পরে নিষ্ক্রিয় থেকেছে, কখনো উসকানি দিয়েছে; যে জন্য ১৯৬৪ সালের দাঙ্গায় ছাত্র-পেশাজীবীদের স্লোগান তুলতে হয়েছে ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও।’ সেই সক্রিয় প্রতিবাদের মুখে অনেক কাটাকুটির পর সহিংসতা বন্ধ হয়েছে, অশান্ত এলাকা শান্ত হয়েছে।

নাসিনরনগর অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে গর্বিত বাংলাদেশের মুখে এক পোঁচ কালিমা। কারণ এর ব্যাপকতা, কারণ এর বাধাহীন দীর্ঘস্থায়ী চরিত্র, কারণ এর অনৈতিকতা, ন্যায়নীতিহীনতা, যা বিস্তৃত নিষ্ক্রিয় পুলিশি ব্যবস্থাপনায়, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার প্রশাসনে, সর্বোপরি সংসদ ও মন্ত্রী পর্যায়ে। সবাই হাত-পা গুটিয়ে মজা করে চুপচাপ বসে থেকে বাস্তবে দুর্বৃত্তদের অপরাধে উৎসাহিত করেছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। তাই নাসিরনগরের ঘটনাকে অমানবিক বর্বরতা বলাই সংগত। যেখানে রয়েছে প্রশাসনের পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা।

আর প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষে লজ্জার কারণ প্রথমত ঘটনা প্রতিরোধ করতে এগিয়ে না যাওয়া, অব্যাহত ধ্বংসযজ্ঞ চলতে দেওয়া, দুর্বৃত্তদের আটক ও শাস্তির ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতা। তদুপরি কারো কারো উসকানিমূলক আচরণ। বিলম্বিত বিচার বিচারহীনতার শামিল বলেই এ ক্ষেত্রে অভিযোগের যুক্তিসংগত তীর একাধিক প্রশাসনের দিকে। মন্ত্রীর কটূক্তি অস্বীকার প্রসঙ্গে বক্তব্যের জবাবে বলতে হয়, সংখ্যালঘু নাগরিকের ঘাড়ে কয়টা মাথা যে তারা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে যাবে?

তবে তারা চুপ থাকলেও বিশিষ্ট নাগরিক প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র একাংশ এবং এ দুই দলে অনুপ্রবেশকারী জামায়াত-শিবিরের লোকজন এ হামলায় সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। উদ্দেশ্য উচ্ছেদ ও সম্পত্তি দখল। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের রয়েছে পরোক্ষ ম“। স্থানীয় সংসদ ও মন্ত্রী ছায়েদুল হক হামলাকারীদের আড়াল করতে গিয়ে কুকর্মে পক্ষভুক্ত হয়েছেন। এসব কারণে নাসিরনগর রামু ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের জন্য লজ্জার আরেক কারণ, এ ব্যাপারে ভারতের উদ্বেগ প্রকাশ ও ঢাকায় কর্মরত তাদের হাইকমিশনারকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার নিদের্শ দান।

দুর্বৃত্তরা যে একাধিক সূত্রে উদ্দীপ্ত তার প্রমাণ এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর নেত্রকোনায় কালীমন্দিরে আগুন (৫.১১.২০১৬)। দুর্বৃত্তপনা প্রসারের কারণ, ‘হামলা হয়, বিচার হয় না’। অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যে দুর্বৃত্তপনার ‘আসর’ হয়ে উঠেছে তার কারণ পত্রিকার ভাষ্যমতে ‘১৬টি মামলার কোনোটিরই অভিযোগপত্র দেয়নি পুলিশ’। তাই বিচার হয়নি, শাস্তি হয়নি। অন্য দুর্বৃত্তরা তাই সাহস পেয়েছে ধ্বংসকাণ্ড চালাতে। সমাজে শান্তি আনতে চাই নাসিরনগরসহ প্রতিটি দুর্বৃত্তপনার দ্রুত যথাযথ শাস্তি-দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। না হলে সমাজ সুস্থির হবে না। সাম্প্রদায়িকতার পাপ থেকে মুক্তি মিলবে না। আর এ জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শর্ষের মধ্যে ভূতের আছর দূর করা।
লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

Print Friendly