হোম অর্থ-বাণিজ্য ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার তাগিদ

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার তাগিদ

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 12:42 pm
68
0

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঋণখেলাপি হয়েও শাস্তি না পাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে দেশে। এতে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে খেলাপি ঋণের হার। চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের এটাই সর্বোচ্চ হার।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) শুরু হয়েছে বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন-২০১৮। রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের প্রথম দিন গতকাল দিনভর আলোচনায় ছিল খেলাপি ঋণের এ উচ্চহার। দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা হিসেবে খেলাপি ঋণকে চিহ্নিত করে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের অতিদ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি ওঠে সম্মেলনে।

Spellbit Limited

বিআইবিএমের উদ্যোগে আয়োজিত সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বেলা ১১টায় শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলন উদ্বোধন করেন। বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ব্যাংকিং সম্মেলন আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব।

উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ব্যাংকিং খাত দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্ব এখন পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংয়ের দিকে এগোচ্ছে। আমরাও নতুন নতুন পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। কিন্তু ইন্টারনেটভিত্তিক এসব ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে তা পুরো ব্যাংকিং খাতে অরাজকতা সৃষ্টি হবে। এজন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনায় করপোরেট কমপ্লায়েন্স ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ সম্মেলনে নতুন নতুন চিন্তা, গবেষণা ও পরামর্শ বেরিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি। সমসাময়িকের পাশাপাশি ভবিষ্যতের অনেক বিষয়ও আলোচিত হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরী দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর পর্যালোচনামূলক বক্তব্য রাখেন। ২০১৭ সালের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তিনি বলেন, গত বছর দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ২০১৬ সালের তুলনায় ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল শিল্পের চলতি মূলধন খাতে। এ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫ দশমিক ৮১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল শিল্পের মেয়াদি ঋণে।

ঋণে বড় প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১৭ সালে দেশের ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সুশাসনের কোনো উন্নতি হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি, বহু ব্যাংক কর্তৃক একই গ্রাহককে ঋণ দেয়া বন্ধ করাসহ হেজ ফিন্যান্সের মতো পদ্ধতিগুলো চালু করা যায়নি। বরং বেশকিছু ঋণ কেলেঙ্কারি, ঋণ ও আমানতের সুদহার নিয়ে কিছু বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তার প্রতারণা, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পাশ কাটানোর ঘটনা ঘটেছে। এসব কারণে গত বছর দেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণ বিতরণের সংস্কৃতিতে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বিআইবিএম মহাপরিচালক বলেন, ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক সরকারি এলসি খোলার কারণে আমদানি বেড়েছে। ট্রেড পেমেন্ট ও ফিন্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে এ সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রক ছিল বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে গত বছরও বৈদেশিক বাণিজ্য ঋণ ঝুঁকি ও খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে বেরোনো যায়নি। এ সময়ে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালার অভাবে বাণিজ্যনির্ভর মানি লন্ডারিংয়ের ঘটনা অব্যাহত ছিল।

যেকোনো ব্যাংকের মুনাফা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় ধরে রাখতে ট্রেজারি বিভাগ কাজ করে জানিয়ে তিনি বলেন, ট্রেজারি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় গত বছর দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতে আমানত ও ঋণ প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়। অথচ ২০১৬ সালে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য ছিল। এ সময় দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের অনুপাত (এডি রেশিও) ৫৫ শতাংশ থাকলেও কিছু বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে তা ৮৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যেকটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সব কাজে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন আইসিসি বিভাগ প্রয়োজন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক আইসিসিডির জন্য নতুন গাইডলাইনও জারি করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় মাত্র একটি ব্যাংক ভালো রেটিং পেয়েছে। দেশের ৬৬ শতাংশ ব্যাংকের রেটিং ছিল মোটামুটি ও অসন্তোষজনক।

ব্যাংকগুলোর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে পুরনো। বিআইবিএমের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তৌফিক আহমদ চৌধূরী বলেন, অধিকাংশ ব্যাংকেই জনবল নিয়োগ, বেতন, বোনাস, চাকরির নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব তৈরির পরিকল্পনা, পদোন্নতি, বদলিসহ কোনো বিষয়েই স্ট্যান্ডার্ড ম্যানুয়াল নেই। ব্যাংকারদের কর্মঘণ্টা অনেক দীর্ঘ ও ভারসাম্যহীন। সব মিলিয়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন বিআইবিএম মহাপরিচালক।

সম্মেলনের প্রথম দিনে দুটি সেশনে নয়টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। প্রথম সেশনে সভাপতিত্ব করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস এ খান। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, এনআরবি ব্যাংকের এমডি মো. মেহমুদ হোসেন ও ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ফারুক মঈনউদ্দীন।

এ সেশনে ‘ডু প্রাইভেট কমার্শিয়াল ব্যাংকস আউটপারফর্ম স্টেট-ওনড কমার্শিয়াল ব্যাংকস? ইমপিরিক্যাল এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রথম গবেষণা প্রবন্ধে বিভিন্ন ব্যাংকের (সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন এবং ইসলামিক) পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা করা হয়।

২০০৯-১৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা এ প্রবন্ধে বলা হয়, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ পরিমাণ অদক্ষ, যার পরে অবস্থান করেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ইসলামিক ব্যাংক। এখানে সরকারি ও ইসলামিক ব্যাংকগুলোর অদক্ষতার মূল কারণ স্কিল ইনইফিশিয়েন্সি।

‘প্রফিট্যাবিলিটি অব ব্যাংকস ইন ইন্ডিয়া: ইমপ্যাক্ট অব মার্কেট স্ট্রাকচার অ্যান্ড রিস্ক’ শীর্ষক দ্বিতীয় গবেষণা প্রবন্ধে ভারতীয় ব্যাংকের বাজার কাঠামো ও মুনাফা ঝুঁকি আলোচনা করা হয়।

এরপর উপস্থাপন করা হয় ‘অ্যানালাইজিং ব্যাংক স্ট্যাবিলিটি ইন ইন্ডিয়া: এভিডেন্স ফরম ২০০৭/০৮-২০১৬/১৭’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ। এতে বলা হয়, ভারতে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো অনেক বেশি স্থিতিশীল, তা বলা যাবে না। যদিও ব্যাংকগুলোর তারল্য মোটামুটি স্থিতিশীল।

প্রথম সেশনের চতুর্থ প্রবন্ধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, ‘এক্সপ্লোরিং দ্য স্ট্র্যাটেজিস অব ম্যানেজিং নন-পারফর্মিং লোনস (এনপিএলএস): অ্যান অ্যানালিটিক্যাল রিভিজিট অব এনপিএল ম্যানেজমেন্ট ইন সিলেক্টেড এশিয়ান কান্ট্রিজ’। এ প্রবন্ধে দেখা যায়, এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার অনেক বেশি।

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের লাগামহীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সম্মেলনে ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এ কারণে অনেক সময় ব্যাংকগুলো ভুল বিনিয়োগ করে। অনেক সময় ঋণের যথাযথ ব্যবহার না হয়ে অন্য খাতে চলে যায়। ব্যাংকারদের মধ্যে বাজার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা থাকতে হবে। শাখা ব্যবস্থাপকদের সতর্ক হতে হবে। ব্যাংকারদের যোগ্যতার ওপর ব্যাংকের সফলতা নির্ভর করে।

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি যোগ্য ব্যাংকারের অভাবকে দেশের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন এনআরবি ব্যাংকের এমডি মো. মেহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, মানবসম্পদকে মূলধনে রূপান্তর করতে না পারলে ব্যাংকিং খাতের উন্নতি হবে না। ব্যাংকের সিংহভাগ আয়ই আসে ঋণ ও ট্রেজারি থেকে। এ খাতের ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকারদের সতর্ক থাকতে হবে।

ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, চীন ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে কার্যকর সফলতা পেয়েছে। আমরাও স্বপ্ন দেখি, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার কঠোর হবে। দেশের ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যোগ্য ব্যাংকার খুঁজে পাওয়া।

সম্মেলনের দ্বিতীয় সেশনে পাঁচটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। এ সেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও বর্তমান উপদেষ্টা এস কে সুর চৌধুরী। আজ সম্মেলনের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে দুটি সেশনে ১০টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে।

আরও পড়ুন:

পদত্যাগী টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীকে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

দুই দিনব্যাপী ডেনিম এক্সপো শুরু