হোম আর্কাইভ নারীদের ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত সংখ্যা বাড়ছে

নারীদের ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত সংখ্যা বাড়ছে

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 11:33 am
60
0

ডেস্ক রিপোর্ট: ব্রেস্ট ক্যান্সারের পরই বিশ্বব্যাপী নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ফুসফুস ক্যান্সারে। ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় শীর্ষ কারণও এটি। যুক্তরাষ্ট্রেও ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের ১২ শতাংশ ভুগছে ফুসফুস ক্যান্সারে। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের নারীরাও যুক্তরাষ্ট্রের সমান হারে ফুসফুস ক্যান্সারে ভুগছেন। হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ওপর জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের মধ্যে ফুসফুস ক্যান্সারের ব্যাপকতার কারণ মূলত ধূমপান ও মদ্যপান। বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে তা অনুপস্থিত। তারপরও কেন তারা উচ্চহারে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, তা জানতে কথা হয় ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। তাদের মতে, পরোক্ষ ধূমপান ও মাটির চুলা থেকে নির্গত ধোঁয়ার কারণেই বেশি হারে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন দেশের নারীরা। জর্দা ও গুলের ব্যবহারও নারীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

Spellbit Limited

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জিল্লুর রহমান ভূইয়া বলেন, পরোক্ষ ধূমপান, বায়ুদূষণ ও চুলার ধোঁয়ার কারণে মূলত নারীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সার বাড়ছে। আমাদের দেশে নারীরা সরাসরি ধূমপান না করলেও পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ধূমপানের কারণে তাদের ফুসফুসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে কারণেই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন।

বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ফুসফুস ক্যান্সারের হার জানতে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ওপর জরিপ পরিচালনা করছে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৫৪৯ জন নারী ক্যান্সার রোগীর তথ্য সংগ্রহ করেছে তারা। তাতে দেখা গেছে, এ রোগীদের ১২ শতাংশ ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অনেককেই ফুসফুস ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। এদের একজন নোয়াখালীর শিমুলিয়া গ্রামের সখিনা হায়দার (৬০)। দুই বছর ধরে তীব্র কাশি ও বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন নোয়াখালীর স্থানীয় একটি হাসপাতালে। এরপর চিকিৎসা নেন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ফুসফুস ক্যান্সার শনাক্ত হয়। সেই থেকে চলছে ক্যান্সারের চিকিৎসা। রেডিওথেরাপি শেষে এখন কেমোথেরাপি চলছে।

বাংলাদেশে নারীদের ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্তের বিষয়টি এতদিন অনেকটা অগোচরে ছিল বলে জানান গবেষক দলের প্রধান ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আর্থসামাজিক কারণে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির তুলনায় নারী রোগীরা অবহেলার শিকার হন বেশি। ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে সাধারণত দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্না করেন। এছাড়া অধিকাংশের পরিবারেই কেউ না কেউ ধূমপায়ী।

কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মাস দেড়েক আগে জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হন পটুয়াখালীর বাউফলের শোভা রানী (৫২)। বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, ফুসফুস ক্যান্সারে ভুগছেন তিনি। সেখান থেকে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। এখন তার কেমোথেরাপি চলছে।

ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের মহিলা ওয়ার্ডে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, গ্রামে বাড়ি হওয়ায় মাটির চুলায় রান্না করতে হয়। চুলার ধোঁয়ায় তীব্র কাশি হতো। পান-জর্দা ছাড়া আর কোনো নেশা ছিল না তার। কাশির কারণে তা-ও ছাড়তে হয়েছে। তবে তার স্বামী ধূমপায়ী।

ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অনকোলজি বিভাগের গবেষণা তথ্য বলছে, গবেষণায় অংশ নেয়া নারী ক্যান্সার রোগীদের গড় বয়স ৫৫ বছর। ৬২ শতাংশ রোগীর ডানদিকের ফুসফুসে ক্যান্সার। অংশগ্রহণকারী ৭২ শতাংশ রোগী নিরক্ষর আর দরিদ্র ৮২ শতাংশ। এদের ৩৯ শতাংশ পান-জর্দায় আসক্ত। সরাসরি ধূমপায়ী ১৫ শতাংশ ও ৫ শতাংশ গুলসেবী।

চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘদিন কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত, ক্রমে ওজন কমে যাওয়া, বুকে ব্যথা ফুসফুস ক্যান্সারের লক্ষণ। তাই তিন সপ্তাহের বেশি কাশি হলে যক্ষ্মার তিনটি পরীক্ষায় যদি যক্ষ্মা শনাক্ত না হয়, তাহলে সিটি স্ক্যান করতে হবে। সিটি স্ক্যানে ফুসফুস ক্যান্সার শনাক্ত হলে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ফুসফুস ক্যান্সার শনাক্ত হলে শুধু অস্ত্রোপচার করলে রোগী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

ডা. মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে এলে ফুসফুস ক্যান্সারের রোগীরা শুধু সার্জারিতেই সুস্থ হয়ে যায়। নারীদের ফুসফুস ক্যান্সারের সব ধরনের চিকিৎসা দেশে সম্ভব। ফুসফুস ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসা টার্গেটেড থেরাপির মাধ্যমে রোগীদের সুস্থ করা যায়। তবে আমাদের দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীদের চিকিৎসার আওতায় আসার হার অনেক কম।

ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের গবেষণাও বলছে, হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা ৮৫ শতাংশ রোগী তৃতীয় পর্যায়ের। প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার শনাক্তের সুবিধা সহজলভ্য করা প্রয়োজন বলে মনে করেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন। তিনি বলেন, দেশে সব ধরনের ক্যান্সার রোগী বাড়ছে। ডায়াগনসিস সুবিধা জেলা পর্যায়ে না থাকায় ক্যান্সার শনাক্ত হচ্ছে দেরিতে। সে কারণে ক্যান্সার নির্ণয়ের সুযোগ-সুবিধা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি ক্যান্সার শনাক্তের বিষয়টি মানুষের হাতের নাগালে আনতে হবে।

এর আগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা তথ্য বলছে, দেশে ক্যান্সার আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্তের হার ২৮ শতাংশ। আর নারী-পুরুষ মিলিয়ে ফুসফুস ক্যান্সারে ভোগার হার ১৮ শতাংশ। বিভিন্ন বয়সী ১১ হাজার ক্যান্সার আক্রান্ত নারী ও পুরুষের ওপর ওই গবেষণা পরিচালিত হয়।

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও পড়ুন:

জেনে নিন, বুকে কফ জমে গেলে করণীয়

মিনিকেট চালে অর্ধেক জিংকও নেই