হোম কর্পোরেট সুশাসন অর্থমন্ত্রীর ব্যাংকিং খাতকে সীমিতকরণ ভাবনায় নতুন ব্যাংকের সংযোজন!

অর্থমন্ত্রীর ব্যাংকিং খাতকে সীমিতকরণ ভাবনায় নতুন ব্যাংকের সংযোজন!

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 8:20 pm
617
0
ব্যাংকিং খাত

মাহমুদ: আমাদের দেশের বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা এখন ৫৮। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৪টি। বাংলাদেশের মতো ছোট্ট উন্নয়নশীল দেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় যে বেশি সেটি ক্ষমতার শেষ সময়ে এসে নিজেই স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, ‘ব্যাংকিং খাত খুব বেশি বড় হয়ে গেছে। অনেক ব্যাংক, অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুটোই বেশি। এটা মনে হয় একটু সীমিতকরণ দরকার হতে পারে।’

এই সীমিতকরণের পক্ষে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর জানা গেছে ‘বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড’, ‘পিপলস ব্যাংক লিমিটেড’ ও ‘সিটিজেন ব্যাংক লিমিটেড’ নামে আরো তিনটি ব্যাংক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ব্যাংক তিনটি অনুমোদন পেলে তখন ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়াবে ৬২তে। এ সব লাইসেন্সের মধ্যে গত ছয় বছরে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশেই ১০টি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

Spellbit Limited

বর্তমানে দেশে তফসিলভুক্ত ৫৮টি ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে ৬টি ও ৩টি সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংক। ৪০টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে আটটি ইসলামী ধারার ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাকি নয়টি বিদেশী ব্যাংক। তফসিলভুক্ত ব্যাংকের বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আরো ৫টি ব্যাংক। এগুলো হলো, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক, জুবেলি ব্যাংক ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক।

২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ব্যাংকের জন্য ৩৭টি আবেদন পায়। এর আলোকে ২০১৩ সালে ৯টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এগুলো হলো, এনআরবি, এনআরবি গ্লোবাল, এনআরবি কমার্শিয়াল, ফারমার্স, মেঘনা, মধুমতি, মিডল্যান্ড, ইউনিয়ন এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক। এর মধ্যে অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে দ্য ফারমার্স ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর কোনো ব্যাংকের অনুমোদন না দেয়ার পক্ষে মত দিলেও ২০১৬ সালে অনুমোদন পায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উদ্যোগে ‘সীমান্ত ব্যাংক’। সম্প্রতি ‘প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক’কেও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর গত আগস্টে অনুমোদন দেয়া হয়েছে পুলিশের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’কে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগামী পর্ষদ সভায় এ ব্যাংকটিকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

প্রশ্ন উঠেছে এতো ব্যাংকের অনুমতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। কারণ, যতোগুলো ব্যাংক আছে, সেগুলোতে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণের ভারে নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। লাগামহীনভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। সর্বশেষ খবর অনুযায়ি খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ইতোমধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ৩৭ হাজার ২৬০ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। সে হিসেবে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত ১০টি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক জুন শেষে ২৫ হাজার ১৪৩ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। একই সাথে ১৩টি বেসরকারি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ১০ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা।ব্যাংকের এই অব্যবস্থাপনা দূর করার জন্য একাধিক উদ্যোগ নিলেও তা ফলপ্রসু হয়নি।

এ অবস্থায় ব্যাংকের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না এনে নতুন করে ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া সমীচীন হবে না। তাছাড়া আমাদের অর্থনীতি বিবেচনায় ও বর্তমান নৈরাজ্য দূর না করে নতুন করে ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হলে সংকট বাড়তে পারে। কারণ, নতুন ব্যাংক নতুন প্রোডাক্ট নিয়ে আসতে পারে না, পুরনো ব্যাংকের প্রোডাক্ট নিয়েই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এছাড়া, নতুন ব্যাংকের অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার বিষয়টি সম্পৃক্ত থাকে। আর রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের অনুমোদন দিলে তার ফল কখনই ভালো হয় না।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আবারো নতুন ব্যাংক অনুমোদন পেলে ব্যাংকিং খাতে অরাজকতা তৈরি হবে। এক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের আলোকেই বলা যায়, ‘ব্যাংকিং খাত খুব বেশি বড় হয়ে গেছে, সীমিতকরণ দরকার।’ তাহলে কেন, কার স্বার্থে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন?

আরো পড়ুন: বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা খেলাপি ঋণ আদায়ে বড় অন্তরায়