হোম কর্পোরেট ক্রাইম ব্যাংকের টাকা লুট করে শাহাবুদ্দিনের ’রাজপ্রাসাদ’

ব্যাংকের টাকা লুট করে শাহাবুদ্দিনের ’রাজপ্রাসাদ’

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 9:54 am
1426
0

কর্পোরেট সংবাদ ডেস্ক: হোসেন গ্লাস ফ্যাক্টরি ছিল চট্টগ্রামের খুলশী এলাকার হাবিব লেনে। ২০০৪-০৫ সালের দিকে ফ্যাক্টরির কর্ণধার মীর হোসেন সওদাগরের কাছ থেকে দুই দফায় প্রায় ৯০ কাঠা জমি কেনেন এসএ গ্রুপের কর্ণধার শাহাবুদ্দিন আলম। দখল করেন দ্য চিটাগং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির ১৯ কাঠাসহ রেলের আরো কিছু জমি। ওই জমিতেই গড়ে তোলেন প্রাসাদোপম বাড়ি। জনশ্রুতি আছে, খুলশীতে শাহাবুদ্দিন আলমের এ বাড়িই এখন চট্টগ্রামের সবচেয়ে বিলাসবহুল বাড়ি। নির্মাণের সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তির ভাষ্যমতে, প্রায় পাঁচ একর জায়গা (খেলার মাঠ ও খোলা জায়গাসহ) ৫৭ হাজার বর্গফুটের তিনতলা বাড়িটির মূল্য জমিসহ ৬০০-৭০০ কোটি টাকা।

ভারতীয় দূতাবাসের পাশেই শাহাবুদ্দিন আলমের প্রাসাদোপম বাড়িতে থাকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। প্রবেশ গেট থেকে অতিথিদের ‘ঘোড়ার গাড়িতে’ করে মূল বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে কথিত আছে।

Spellbit Limited

এসএ গ্রুপের কর্ণধার বাড়িটি নির্মাণ করেন ২০১২-১৩ সালের দিকে। তার আগ থেকেই বিপুল অংকের ব্যাংকঋণ পেতে থাকেন এ ব্যবসায়ী। তার ঘনিষ্ঠজন ও ব্যাংকারদের ভাষ্য, ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের টাকায় এ প্রাসাদ বাড়ি তৈরি করেছেন শাহাবুদ্দিন আলম। পরে ওই ঋণ খেলাপি হতে থাকলে আইনের আশ্রয় নিতে থাকে ব্যাংকগুলো। সেই মামলার একটিতে গ্রেফতার হয়ে তিনি এখন কারাগারে। তার বিরুদ্ধে জমি দখলের মামলা করেছে চিটাগং কো-অপারেটিভ হাউজিংও।

শাহাবুদ্দিন আলমের প্রতিষ্ঠান এসএ গ্রুপের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে পূবালী ব্যাংকের। বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও ব্যাংকটির ঋণ পরিশোধ না করায় এরই মধ্যে শাহাবুদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ব্যাংকটি। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, বিলাসবহুল চট্টগ্রামের বাড়িসহ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে শাহাবুদ্দিন আলমের বেশ কয়েকটি বাড়ি, ফিলিং স্টেশন, বহুতল মার্কেটসহ স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। ব্যাংকের টাকায়ই তিনি এসব সম্পত্তি গড়েছেন বলে শুনেছি।

বাড়িটি নির্মাণের সময় নির্মাণ উপকরণ সরবরাহকারী একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাড়িটি নির্মাণে ছয় ফুট বাই চার ফুটের একটি বড় টু-ডি ল্যান্ডস্কেপ করা হয়। ল্যান্ডস্কেপ অনুযায়ী, মূল ভবনটি তিনতলাবিশিষ্ট ডুপ্লেক্স আকৃতির। তবে এ বাড়িতে রয়েছে একাধিক ভবন। বাড়ির কাজে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য রয়েছে আলাদা ভবন। রয়েছে একাধিক স্থায়ী মঞ্চ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রান্নার প্রয়োজনে মূল বাড়ির বাইরে রয়েছে শেডযুক্ত রান্নাঘর। আরো আছে মিউজিয়াম, হেলিপ্যাড, লাইব্রেরি, একাধিক খেলার মাঠ ও কোর্ট, জিমনেসিয়াম, কনফারেন্স হল, বৈঠকখানা, বাগান, পার্ক ও শিশুদের খেলার স্থান। ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরের বড় অংশ নিয়ে তৈরি করা হয়েছে সর্বাধুনিক সুইমিংপুল। বাড়ির নিরাপত্তায় রয়েছে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি।

বাড়িটি নির্মাণে প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী আনা হয়েছে বিদেশ থেকে। বাড়ির বাগান সৃজনে ব্যবহার করা হয়েছে বিদেশী গাছ, মাটি ও উপাদান। এক্ষেত্রেও প্রতারণার শিকার হয়েছেন এসব সরবরাহকারী।

চট্টগ্রামের স্থানীয় এক আমদানিকারকের মাধ্যমে প্রায় ৩০ লাখ টাকার বিদেশী গাছ ও ফুলের চারা সংগ্রহ করেন শাহাবুদ্দিন আলম, যদিও অধিকাংশ টাকা এখনো পরিশোধ করেননি।

বাড়িটির বাগান ও সবুজায়নের দায়িত্বে ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিক। প্রায় এক বছর লোকবল নিয়ে বাগান সৃজনের কাজ করেন তিনি। তাকেও পাওনার পুরো টাকা পরিশোধ করেননি শাহাবুদ্দিন আলম। বাগানের জন্য নেয়া অতিরিক্ত চারা এখনো শাহাবুদ্দিনের প্রাসাদ বাড়িতে পড়ে আছে, মোহাম্মদ রফিককে ফেরত দেননি।

বিদেশী নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার ছাড়াও বাড়িটি নির্মাণে আর্কিটেক্ট আনা হয়েছে ভারত থেকে। ব্যাংকের ঋণ সমন্বয়ে এরই মধ্যে বাড়িটি তার পুত্রবধূর নামে হেবা করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

পাওনাদার ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা শাহাবুুদ্দিনের প্রাসাদ বাড়িতে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন, তাদের বর্ণনা মতে, চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম বিলাসবহুল বাড়ি এটি। যেখানে হেলিপ্যাড, সুইমিংপুল ও ব্যায়ামাগারসহ অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। বাড়ির ভেতরে পুকুর সমান সুইমিংপুলের নিচে রয়েছে স্বচ্ছ গ্লাস। পুরো বাউন্ডারির মধ্যে দুটি ভবন। মূল ভবনটি তিনতলাবিশিষ্ট, যেটি শাহাবুদ্দিন আলমের পরিবারের থাকার জন্য। মূল ভবনের ড্রয়িং রুমটি ডিম্বাকৃতি। অন্যটা দোতলা ভবন। যেখানে তার অফিস স্টাফ, গেস্ট রুম ও নিরাপত্তাকর্মীরা থাকেন। বাড়িটির দৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় মূল ফটক দিয়ে প্রবেশের পর বিশেষায়িত যানের মাধ্যমে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় অতিথিদের। ছেলে-মেয়ের বিয়ে, বাড়ি উদ্বোধন ও পারিবারিক যেকোনো অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের রাজকীয় অভ্যর্থনা দেয়া হয় ব্যাংকের ঋণে তৈরি শাহাবুদ্দিন আলমের বিলাসবহুল এ বাড়িতেই।

প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, মূল ফটকের ভেতর বাড়ির আঙিনায় সার্বক্ষণিক সাত-আটজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত থাকে। পরিবারের ব্যবহারের জন্য গাড়ি রয়েছে ৮-১০টি, যার মধ্যে আছে পাজেরো স্পোর্টস কার, আউডি, টয়োটা, ল্যান্ড ক্রুজারসহ বিলাসবহুল গাড়ি।

খুলশীতে ভারতীয় দূতাবাস পার হতেই হাবিব লেনের শেষ প্রান্তে শাহাবুদ্দিন আলমের প্রাসাদোপম বাড়িটির অবস্থান। বাড়ি নম্বর-৪৩৭৯। গতকাল বাড়িটির মূল ফটকের সামনে যেতেই নিরাপত্তাকর্মীরা বেরিয়ে আসেন। পরিচয় জানার পর ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেননি। বাইরে থেকে দেখা যায়, সাত-আটজন নিরাপত্তাকর্মী। বাড়িতে শাহাবুদ্দিন আলমের পরিবারের কেউ নেই বলে জানান তারা।

শাহাবুদ্দিন আলমের পিতা মো. শামসুল আলম ছিলেন দক্ষিণ মধ্যম হালিশহরের বাসিন্দা। চট্টগ্রামের বকশীরহাটে পারিবারিক একটি কাপড়ের দোকান ছিল তার। এছাড়া নিজ এলাকার পুকুরপাড় অঞ্চলে বাল্বের ছোট একটি ফ্যাক্টরি ছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর মধ্যম হালিশহরের বাসিন্দা চট্টগ্রামের বনেদি ব্যবসায়ী ইমাম শরীফ সওদাগরের ছেলে মো. আবুল কালাম তার মেয়েকে শাহাবুদ্দিন আলমের সঙ্গে বিয়ে দেন। আবুল কালামের ছেলেরা ছোট থাকায় শ্বশুরের ব্যবসার দেখাশোনা করেন শাহাবুদ্দিন আলম। মূলত তার ব্যবসার মূলধন তৈরি হয় সেখান থেকেই। শ্বশুরের ব্যবসা দেখাশোনার সময়ই শাহাবুদ্দিন আলম নিজের ব্যবসাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে তোলেন। শ্বশুরদের দীর্ঘদিনের পুরনো পারিবারিক ব্যবসা কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে শ্বশুরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এরপর থেকেই বাবার নামে একাধিক শিল্প-কারখানা স্থাপনে মনোযোগী হন তিনি।

এক সময় পৈতৃকভাবে উল্লেখযোগ্য জমি না থাকলেও বর্তমানে মাইলের মাথা এলাকার মূল সড়কের দুই পাশের অধিকাংশ জমিই শাহাবুদ্দিন কিনে নিয়েছেন। ওই এলাকার লায়লা ফিলিং স্টেশনের মালিকানাও তার নামে।

শাহাবুদ্দিন আলমের এক নিকটাত্মীয় নাম প্রকাশ না করে বলেন, এক দশক আগেও শাহাবুদ্দিন আলমের ব্যবসা বলতে উল্লেখ করার মতো কিছু ছিল না। ব্যাংক থেকে বড় বড় ঋণ নেয়ার পর থেকেই নিজ এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ জমিগুলো কিনে নেন তিনি। এয়ারপোর্ট রোডের উভয় পাশের গুরুত্বপূর্ণ জমিগুলো কিনে মার্কেট নির্মাণ করেছেন।

ঋণের টাকায় শাহাবুদ্দিন আলম বিলাসবহুল বাড়ি ও সম্পদ গড়লেও ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করেননি। বর্তমানে তার কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা রয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। পাওনা আদায়ে ব্যাংকগুলো আইনের আশ্রয় নিয়েছে। গত কয়েক বছরে এসএ গ্রুপের কর্ণধারদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে এ পর্যন্ত দেড়শর বেশি মামলা করেছে পাওনাদার ব্যাংক। ব্যাংক এশিয়ার এক মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন চট্টগ্রামের এ ব্যবসায়ী।সূত্র: বণিক বার্তা।

আরও পড়ুন: