হোম আর্কাইভ কে কিনছে বাংলালিংক?

কে কিনছে বাংলালিংক?

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 10:11 am
453
0
গ্রামীণ

ডেস্ক রিপোর্ট: নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিবর্তন আসছে বৈশ্বিক টেলিকম বাজারেও। অলিগোপলি বাজার ডুয়োপলিতে রূপ নিচ্ছে। ব্যবসা গুটিয়ে কিংবা একীভূতকরণের মাধ্যমে অপারেটরের সংখ্যা কমছে। প্রতিবেশী ভারতের টেলিকম বাজারও ডুয়োপলির দিকে যাচ্ছে। দেশটিতে চার সেলফোন অপারেটর কার্যক্রমে থাকলেও প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে মূলত দুই অপারেটরের মধ্যে। চীনে অপারেটরের সংখ্যা তিনটি থেকে দুটিতে নেমে আসছে।

পঞ্চম প্রজন্মের (ফাইভজি) নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার উন্নয়নে একীভূত হচ্ছে চায়না ইউনিকম ও চায়না টেলিকম। অপারেটরের সংখ্যা কমে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বাংলাদেশেও। রবি-এয়ারটেল একীভূত হওয়ার পর আলোচনা চলছে বাংলালিংকের প্রস্থান নিয়েও। ক্রেতা হিসেবে কেউ রবি, কেউ গ্রামীণফোন, কেউ আবার অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনাও দেখছেন।

Spellbit Limited

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিটক শুরু থেকেই বেসরকারি খাতের তিন অপারেটরের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। আর রবির সঙ্গে এয়ারটেলের একীভূতকরণের পর বাংলালিংকও পিছিয়ে পড়েছে শীর্ষ দুই অপারেটরের চেয়ে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আর্থিক লোকসানে থাকা অপারেটরটি এখন ক্রেতা খুঁজছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীর খোঁজে দেশের বাইরে বৈঠকও করেছে অপারেটরটি।

সম্প্রতি বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল টেলিকম হোল্ডিং (জিটিএইচ) অধিগ্রহণের প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে বৈশ্বিক টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভিওন। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে থাকা গ্লোবাল টেলিকম হোল্ডিংয়ের সম্পদ অধিগ্রহণের প্রস্তাব গত ১১ অক্টোবর বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে গত জুলাইয়ে প্রস্তাবটি দিয়েছিল ভিওন। বর্তমানে জিটিএইচে ভিওনের ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

২০০৫ সালে ১০ লাখ গ্রাহকসংখ্যা অর্জন করে বাংলালিংক। গ্রাহকসংখ্যার ভিত্তিতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেলফোন অপারেটর হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আবির্ভাব ঘটে ২০০৭ সালে। ২০০৮ সালে ১ কোটি গ্রাহকের মাইলফলক অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ২০১৬ সালের শেষদিকে রবি-এয়ারটেলের একীভূতকরণের পর গ্রাহকসংখ্যার ভিত্তিতে দীর্ঘদিন দ্বিতীয় স্থানে থাকা বাংলালিংক নেমে এসেছে তৃতীয় স্থানে।

গত এক দশকের বেশি সময়েও মুনাফা অর্জন করতে পারেনি বাংলালিংক। ২০১৫ সালে একটি প্রান্তিকে মুনাফা হলেও সামগ্রিকভাবে বছরটিতে মুনাফা করতে পারেনি বাংলালিংক। গত বছরও প্রতিষ্ঠানটির আয় কমেছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ভিওনের ২০১৭ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বাংলালিংকের আয় হয়েছে ৪ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ৪ হাজার ৮৭০ কোটি। বছরটিতে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ করেছে ৮২০ কোটি টাকা। আবার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নিলামে তরঙ্গ কিনতে বাংলালিংক প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

গ্রাহকপ্রতি আয়ের বিবেচনাতেও দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বাংলালিংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সাল শেষে গ্রামীণফোন ছাড়া অন্য দুই বেসরকারি সেলফোন অপারেটরের গ্রাহকপ্রতি আয় (এআরপিইউ) কমেছে। বছরটির শেষে গ্রামীণফোনের গ্রাহকপ্রতি আয় ছিল ১৬৭ টাকা, রবির ১২৩ ও বাংলালিংকের ১১১ টাকা। রবি ও বাংলালিংকের গ্রাহকপ্রতি ওই আয় গত পাঁচ বছরের মধ্যে ছিল সর্বনিম্ন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) গ্রামীণফোনের গ্রাহকপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছে ১৫৬ টাকা। আর রবি ও বাংলালিংকের গ্রাহকপ্রতি আয় হয়েছে যথাক্রমে ১১৭ ও ১০৯ টাকা।

চলতি মাসে মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) সেবা চালু হয়েছে। এতে নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহকরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার হিসাবে, সেবাটি চালুর পর প্রথম সপ্তাহে অপারেটর পরিবর্তন করেছে ৪ হাজার ১৮১ জন। এর মধ্যে বাংলালিংক ১ হাজার ৮৯ জন গ্রাহক পেলেও হারিয়েছে ১ হাজার ২৭৬ জন।

বাংলালিংকের করপোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার আংকিত সুরেকা বলেন, বর্তমানে টেলিকম খাতের কিছু ক্ষেত্রে একাধিপত্য বিরাজ করছে। একটি ছাড়া বাংলাদেশের কোনো মোবাইল অপারেটরই এ মুহূর্তে লাভজনক অবস্থানে নেই। অপারেটরদের এ অসম অবস্থানের কারণে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে গ্রাহকরা অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আমরা আশা করি, টেলিকম খাতের পরিস্থিতি ও সর্বোপরি গ্রাহকদের সুবিধা বিবেচনা করে সরকার এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, যা ছোট অপারেটরগুলোকে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে গ্রাহকদের উন্নতমানের সেবা দিতে সাহায্য করবে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের টেলিকম খাতে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত বোধ করবেন। এর ফলে ভবিষ্যতে বিদেশী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা টেলিকম খাতের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত লোকসানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে বড় অংকের ঋণের বোঝাও। তহবিল সংগ্রহে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঁচ বছর মেয়াদি ৩০ কোটি ডলার মূল্যের বন্ড ছাড়ে বাংলালিংক। সংগৃহীত অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ ও মূলধনি ব্যয় নির্বাহের লক্ষ্য ছিল বাংলালিংকের। এটির মেয়াদ পূর্ণ হবে ২০১৯ সালের মে মাসে।

এর বাইরে আরো ৫০ লাখ ডলার ঋণ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। গত প্রায় দুই বছরে বিপুল কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি নানা ধরনের ব্যয়সংকোচনের পথে হাঁটছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৬ সাল থেকে একাধিক পর্যায়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের এ কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এর পরও আগামী বছরগুলোতে বড় ধরনের আর্থিক চাপ প্রতিষ্ঠানটির জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।এ অবস্থায় বাংলালিংকের প্রস্থানের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে ক্রেতা হিসেবে গ্রামীণফোন কিংবা রবিকে এগিয়ে রাখছেন তারা। এ দুই অপারেটরের বাইরের কোনো ক্রেতার সম্ভাবনাও তারা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

রবি-এয়ারটেল একীভূতকরণের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র পলিসি ফেলো আবু সাইদ খান  বলেন, রবিতে ৩০ শতাংশ মালিকানা ছিল বিশ্বের অন্যতম সেরা অপারেটর এনটিটি ডোকোমোর। এ মালিকানা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশে। আবার আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ব্যবসা করছে ভারতী এয়ারটেল। অথচ রবির সঙ্গে একীভূতকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে চলে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিনিয়োগকারীরা এ দেশে ব্যবসা করতে আসে।

তাদের লক্ষ্যই থাকে ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন। মানসম্মত সেবাদান ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের জন্য যে ধরনের নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা প্রয়োজন, দেশে তার অভাব রয়েছে। অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে সেলফোন অপারেটরদের এরই মধ্যে নানা ধরনের বিধিনিষেধ রয়েছে। অপারেটরদের বিনিয়োগও তাই সংকুচিত হয়ে এসেছে। ফলে তাদের সহজেই চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

গ্রাহকসংখ্যার ভিত্তিতে বাজার দখলও কমছে বাংলালিংকের। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে তিন মাসই গ্রাহক হারিয়েছে অপারেটরটি। গ্রাহকসংখ্যার বিবেচনায় আগস্ট শেষে সেলফোন অপারেটরটির বাজার দখল দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৭১ শতাংশ। ২০১০ সালের পর এটিই বাংলালিংকের সর্বনিম্ন বাজার দখল।

দেশের টেলিকম বাজারে যাতে কোনো মনোপলি না হয় সে ব্যাপারে সরকার সচেষ্ট বলে জানান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান অপারেটরদের মধ্যে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সেবাদান নিশ্চিতে কাজ করছি। বাজার মনোপলি যাতে না হয় সেজন্য এমএনপি সেবা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলকভাবে মানসম্পন্ন সেবা পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। এর পাশাপাশি এসএমপি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। খাতটিতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে চাই। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতাই হচ্ছে মূল বিষয়, যার মাধ্যমে সামনে যেতে হবে।’

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে সেবা টেলিকমের শতভাগ শেয়ার কিনে নেয় মিসরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওরাসকম টেলিকম হোল্ডিংস (ওটিএইচ)। পরের বছর বাংলালিংক ব্র্যান্ড নামে সেবা চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে ওটিএইচের সিংহভাগ শেয়ার কিনে নেয় ভিম্পেলকম। আর ২০১৩ সালে ওটিএইচের নাম পরিবর্তন করে গ্লোবাল টেলিকম হোল্ডিংস (জিটিএইচ) এবং ওরাসকম বাংলাদেশ লিমিটেডের নাম বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেড রাখা হয়। চলতি বছরের আগস্ট শেষে অপারেটরটির গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৩৪ লাখ।

বণিক বার্তা

আরও পড়ুনঃ
১০ কোটি ডলারে মিউজিক কোম্পানি অ্যাসাই কিনল অ্যাপল
ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয় যেভাবে