Home অর্থ-বাণিজ্য মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

Published:October 11, 2018


Published: 11:34:14
49
0

কর্পোরেট সংবাদ ডেস্ক: মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞরা। মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং সেবাগুলো এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে বলে তারা মত প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) জরিপ ও গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

গতকাল ‘মানি লন্ডারিং ভালনারেবিলিটিজ ইন নিউ পেমেন্ট সিস্টেমস: বাংলাদেশ কনটেক্সট’ শীর্ষক কর্মশালায় এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তুলে ধরে বিআইবিএমের অধ্যাপক ও পরিচালক (ট্রেনিং) ড. শাহ মো. আহসান হাবীবের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি দল। রাজধানীতে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম, অনলাইন ভার্চুয়াল কারেন্সি, ইলেকট্রনিক ওয়ালেট পেমেন্ট, সোস্যাল নেটওয়ার্ক কারেন্সি নামে বিভিন্ন ধরনের পেমেন্ট সিস্টেম চালু রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ে সম্ভাব্য মানি লন্ডারিং ঠেকাতে বক্তারা সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোরারোপ করেন। এজন্য তারা বাংলাদেশ ব্যাংক ও মোবাইল অপারেটরদের একযোগে কাজ করার পরামর্শ দেন।

বিআইবিএমের প্রতিবেদনে ব্যাংকারদের ওপর পরিচালিত একটি জরিপের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, কার্ডের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংকাররা তদন্তের জটিলতাকে চিহ্নিত করেছেন। ৬৪ শতাংশ ব্যাংকার মনে করেন, কার্ডভিত্তিক লেনদেন তদন্তের জটিলতা মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্র সৃষ্টি করছে। ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, অজানা উেসর আয় মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া ১৬ শতাংশ ব্যাংকার নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবকে এক্ষেত্রে দায়ী মনে করেন।

এতে বলা হয়, ২০১৭ সাল শেষে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা আট কোটি ছাড়িয়েছে। আর মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৪ কোটি ৫০ লাখ পেরিয়েছে। দেশের ১৮টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাচ্ছে। ৫ কোটি ৮৮ লাখ ২৫ হাজার ৪১৪ জন গ্রাহক মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় নিবন্ধিত। এর মধ্যে সক্রিয় লেনদেন করছেন ২ কোটি ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৩২১ জন গ্রাহক। ২০১৭ সালে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। দেশে ১৮টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালালেও এ খাতের ৮১ দশমিক ৪০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে ‘বিকাশ’। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্য ১৪টি ব্যাংক মাত্র ১ দশমিক ৮০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।

জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ ব্যাংকার বেনামি লেনদেনের কারণে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করেন। তবে ৫৭ শতাংশ ব্যাংকার এ ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে অবৈধ আন্তর্দেশীয় লেনদেনকে দায়ী করেছেন। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং ঘিরে সংঘটিত অপরাধ তদন্তের দুর্বলতা ও এজেন্টের মাধ্যমে ভুল লেনদেনকে ঝুঁকি তৈরির জন্য দায়ী মনে করেন ১৬ শতাংশ ব্যাংকার।

একইভাবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি দেখছেন ব্যাংকাররা। জরিপে অংশ নেয়া ৮৩ শতাংশ ব্যাংকার ঝুঁকি তৈরির জন্য এজেন্ট নির্বাচনে ভুলকে দায়ী করেছেন। গ্রাহক বাছাইয়ে দুর্বলতাকেও এক্ষেত্রে চিহ্নিত করেছেন ব্যাংকাররা।

বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরীর সভাপতিত্বে কর্মশালায় বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের চেয়ার প্রফেসর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা, পূবালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি, ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি ও সিইও ফারুক মঈনুদ্দিন আহমেদ, সাউথইস্ট ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম মাঈনুদ্দিন চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক লিলা রশীদ, আইপে সিস্টেম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জাকারিয়া স্বপন, এনবিআরের প্রথম সচিব সৈয়দ মুশফিকুর রহমান প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা বলেন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও জনশক্তি নেই। এদিকে নজর দিয়ে ব্যাংকারদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।

অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, শুধু আইটি অফিসারদের নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের কর্মীদের আইটি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আইটিতে অনেক এগিয়ে বলে অন্য ব্যাংক তার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

অধ্যাপক ইয়াছিন আলি বলেন, আইন করার সময় ব্যাংকিং অপারেশনের কোনো ক্ষতি যাতে না হয়, সে দিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিতে হবে।

ফারুক মঈনুদ্দিন আহমেদ বলেন, গ্রাহক ও ব্যাংকার সব পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষত এজেন্টদের সচেতনতা জরুরি। অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমে গতি বাড়লেও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা চালু হয়নি। এটা রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দোহাই দিলে হবে না, সচেতনতা বাড়াতে হবে।

এসএম মাঈনুদ্দিন চৌধুরী বলেন, মানবসম্পদকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি এনবিআর, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নির্বাচন কমিশন ও আইসিটি মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

লিলা রশীদ বলেন, মোট লেনদেনের ৬ শতাংশ হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এ ধরনের ব্যাংকিং সম্প্রতি শুরু হয়েছে। আরো নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে কিছুটা সময় লাগবে। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে দ্রুত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

জাকারিয়া স্বপন বলেন, বাংলাদেশে ই-আর্থিক সেবা চালু করতে অনেক হয়রানি হতে হয়। তবে নন-ব্যাংক পেমেন্টের অনেক সুযোগ রয়েছে। চাহিদার বিপরীতে অনেক কম সেবা দিতে পারছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের বিষয়ে আরো সচেতন ও সচেষ্ট হতে হবে।

সমাপনী বক্তব্যে ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরী বলেন, আগামী দিনে ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরো সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য নতুন পেমেন্ট সিস্টেমের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

আরো পড়ুন:

মোটরসাইকেলের জন্য পৃথক শিল্পপার্ক চায় বিএমএএমএ