Home কর্পোরেট সংবাদ বন্ধ হচ্ছে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রতিষ্ঠান

    বন্ধ হচ্ছে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রতিষ্ঠান

    Published:September 13, 2018
    বন্ধ হচ্ছে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রতিষ্ঠান


    Published: 11:11:32
    149
    0

    নিজস্ব প্রতিনিধি: কয়েক বছর আগেও চট্টগ্রামের প্রথম সারির আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ছিল মাওলানা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (এমডিসি)। ২০০৫ সালে আবাসন ব্যবসা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ে ভালো সুনাম অর্জন করে। বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামে প্রায় অর্ধশত বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে মাওলানা গ্রুপের এ প্রতিষ্ঠানের হাত দিয়ে। কিন্তু আবাসন খাতে মন্দা, ব্যবসায় লোকসানসহ বিভিন্ন কারণে এখন বন্ধের পথে আবাসন কোম্পানিটি।

    খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামে রড-সিমেন্টের ব্যবসা শুরু করেন আগ্রাবাদের বাসিন্দা মোহাম্মদ তৈয়ব উল্লাহ। নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত রড-সিমেন্টসহ নির্মাণ খাতে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করেন তিনি। বৃদ্ধ বয়সে এসে ১৯৯৩ সালে ব্যবসা তুলে দেন ছেলেদের হাতে। বাবার অর্জিত সম্পদ ও সুনাম কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন তৈয়ব উল্লাহর পাঁচ ছেলে। পিতার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান মাওলানা অ্যান্ড সন্সের সুনামের কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজে ঋণ সুবিধা পান তারা। এরপর মাওলানা অ্যান্ড সন্স থেকে ‘মাওলানা গ্রুপ’ নাম দিয়ে গড়ে তোলেন একের পর এক প্রতিষ্ঠান— মাওলানা পাওয়ার প্লাস প্রাইভেট লিমিটেড, মাওলানা ফিলিংস অ্যান্ড সিএনজি ওয়ার্কস, মাওলানা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, এমএফসি (রেস্টুরেন্ট), মুকুট এন্টারপ্রাইজ, মাওলানা ফিশারিজ অ্যান্ড ফার্মস লিমিটেড, রাজমুকুট কমিউনিটি সেন্টার, মাওলানা লজিস্টিক অ্যান্ড শিপিং ও মাওলানা ফার্নিচার।

    কিন্তু অদূরদর্শী পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই এখন বন্ধ। শুরুর দিকে ভালো ব্যবসা করলেও আবাসন খাতের মন্দায় বন্ধের পথে গ্রুপটির একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান এমডিসি।

    ব্যবসায় এমন পতনের বিষয়ে জানতে চাইলে মাওলানা অ্যান্ড সন্সের ব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলো সহজে অর্থায়ন করায় বাজার পর্যালোচনা ছাড়াই বিভিন্ন খাতের ব্যবসায় নামে মাওলানা অ্যান্ড সন্স। অল্প সময়ের মধ্যে ফার্নিচার, কম্পিউটার অ্যাকসেসরিজ, জেনারেটর, আইপিএস, সার, গ্লোবাল সল্ট, বিটুমিনসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু আমদানি ব্যবসার প্রতিটিতে বড় অংকের লোকসান গুনতে হয় তাদের। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম ব্যবসা ছিল পরিবহন খাতে; বিশেষ করে ট্রাক ও লরির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় আমদানি-রফতানি কমে গেলে পরিবহন খাতে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয়। কিন্তু ব্যাংক ঋণে কেনা এ গাড়িগুলোর সুদ দিন দিন বাড়তে থাকে। একইভাবে সিমেন্টের ব্যবসায় মাঠ পর্যায়ে বড় অংকের টাকা আটকে যায় প্রতিষ্ঠানটির।

    বিভিন্ন খাতে ক্রমাগত লোকসানের ফলে প্রতিষ্ঠানটির নাজুক অবস্থা তৈরি হলে ভাইদের মধ্যে অনৈক্য বাড়ে। এতে ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে আর কেউ এগিয়ে আসেনি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ২০০ কোটি টাকা খেলাপি রয়েছে। ব্যাংক ও আইনি ঝামেলা এড়াতে এরই মধ্যে দেশ ছেড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এএইচএম শোয়েব।

    সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তথ্যমতে, মাওলানা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মাওলানা অ্যান্ড সন্সের কাছে ব্যাংক এশিয়ার প্রায় ৫০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এই পাওনা আদায়ে এরই মধ্যে আদালতে মামলা করেছে ব্যাংকটির আন্দরকিল্লা শাখা। একই প্রতিষ্ঠানের কাছে ৪৩ কোটি টাকা পাওনা সাউথইস্ট ব্যাংক সিডিএ শাখার। এ পাওনা আদায়ে ২০১৬ সালে মামলা করে ব্যাংকটি। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিকে দেয়া ঢাকা ব্যাংক হালিশহর শাখার ২০ কোটি টাকা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের হালিশহর শাখার প্রায় দেড় কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান মাওলানা শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিকসের কাছে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে প্রাইম ব্যাংকের। বহু চেষ্টার পরও ঋণের টাকা ফেরত না পেয়ে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।

    গ্রুপটির আরেক প্রতিষ্ঠান মাওলানা এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের কাছে ইসলামী ব্যাংকেরও অর্থ পাওনা রয়েছে। দুই কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। এছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও লিজিং প্রতিষ্ঠান আইডিএলসির বড় পাওনা রয়েছে মাওলানা গ্রুপের কাছে। এ পাওনা আদায়ে এরই মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটির বহু সম্পত্তি নিলামে তুলেছে।

    ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাবা মারা যাওয়ার পর পাঁচ ভাই মিলে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। কিন্তু ব্যবসায় লোকসান হলে ভাইদের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়। ব্যবসা পরিচালনায় ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে ভাইয়েরা একসঙ্গে থাকলেও ঋণ পরিশোধে এখন কেউ এগিয়ে আসছেন না। বিশেষ করে গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে থাকা এ এইচ এম শোয়েব আমেরিকায় চলে যাওয়ায় ঋণের টাকা ফেরত পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেছে।

    জানা গেছে, ২০০৮-০৯ সালের দিকে ব্যাংক এশিয়া আন্দরকিল্লা শাখা থেকে ঋণ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমদিকের কিস্তিগুলো ভালোই পরিশোধ করে। কিন্তু ২০১১-১২ সালের পর নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেনি। এমনকি ২০১৪ সাল থেকে আর কোনো টাকাই দেয়নি। বহু দেনদরবারের পরও ঋণের টাকা ফেরত না আসায় আদালতে যেতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

    এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস ও আন্দরকিল্লা শাখার হেড অব ব্রাঞ্চ মো. শামসুল আলম বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় ঋণ দিয়েছি। কিন্তু সময়মতো ঋণের টাকা ফেরত না দেয়ায় আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এরই মধ্যে টাইগারপাস এলাকার মাওলানা সিএনজি ফিলিং স্টেশন বিক্রি করে কিছু টাকা পরিশোধ করেছে তারা। এখনো প্রায় ৫০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কাছে। যদিও ঋণের বিপরীতে যেই পরিমাণ সম্পত্তি বন্ধক রয়েছে তা খুবই সামান্য। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান গা-ঢাকা দেয়ায় অন্যান্য কর্ণধাররাও ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসছেন না।

    প্রাইম ব্যাংক ওআর নিজাম রোড শাখার ব্যবস্থাপক তৌহিদুল করিম বলেন, মাওলানা গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেয়া হলেও মামলায় গ্রুপের দায়িত্বে থাকা সবাইকে বিবাদী করা হয়েছে। কারণ ঋণ পেতে অন্য সহোদররা গ্যারান্টার হিসেবে ছিলেন।

    মাওলানা শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিকের বিরুদ্ধে প্রাইম ব্যাংকের দায়ের করা মামলায় পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে এ এইচ এম শোয়েবকে গ্রুপের চেয়ারম্যান, মোহাম্মদ ইলিয়াছকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাকি তিন ভাই আবদুল কাদের জিলানী, শরফুল হক ও মো. আসরারকে পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

    এ বিষয়ে মাওলানা ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির (এমডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাদের জিলানী বলেন, মাওলানা অ্যান্ড সন্সের নামে নেয়া ঋণগুলো খেলাপি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আমাদের বড় ভাই শোয়েব। তিনি দেশের বাইরে আছেন। আমার প্রতিষ্ঠান এমডিসি। এমডিসির নামে নেয়া ঋণের কোনোটাই এখনো খেলাপি হয়নি। যদিও আবাসন ব্যবসা ভালো না হওয়ায় আমরা এই খাতের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি।

    আরও পড়ুন: 

    সংসদে ১০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ

    ইয়ামাহা’র “রেভস্টার মিট” অনুষ্ঠিত