হোম কর্পোরেট সুশাসন ধনীরাই আরও বেশি ধনী হচ্ছে

ধনীরাই আরও বেশি ধনী হচ্ছে

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 6:34 pm
472
0
ধনী

মাহমুদুন্নবী: নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। সে অর্থে আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের নাগরিক।

প্রতিবছর ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় অনুসারে দেশগুলোকে চারটি আয় গ্রুপে ভাগ করে। যাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৪৫ ডলার বা তার নিচে, তাদের বলা হয় নিম্ন আয়ের দেশ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে এ তালিকাতেই ছিল।

Spellbit Limited

মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্য অবশ্যই একটি বড় অর্জন। তবে এটির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি বাস্তবেও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়টি হয়েছে।

মূলত: ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে শুরু করে যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার, তারা মধ্যম আয়ের দেশের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে আবার আয় ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে শুরু করে ৪ হাজার ১২৫ পর্যন্ত হলে তা হবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং আয় ৪ হাজার ১২৬ ডলার থেকে শুরু করে ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার হলে দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। এর চেয়ে বেশি মাথাপিছু জাতীয় আয় হলে সেই দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ আয়ের দেশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৩১৪ ডলার। তবে বিশ্বব্যাংকের পদ্ধতি অনুযায়ী তা এখন ১ হাজার ৪৫ ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণেই নতুন তালিকায় মধ্যম আয়ের দেশ হতে পেরেছে বাংলাদেশ। সরকারের ১০ বছরের প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার কথা বলা আছে। এর আগেই মধ্যম আয়ের দেশ হলো বাংলাদেশ।

যদিও মধ্যম আয়ের দেশে রয়েছে বড় একটা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ যার বড় উদাহরণ ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এমনকি চীন ও রাশিয়াও আটকে আছে মধ্যম আয়ের ফাঁদে। মূলত যারা কেবল আয় বাড়াতেই মনোযোগ দিয়েছে বেশি, অবকাঠামো, শিক্ষাসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন, রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামুখী থাকার দিকে নজর দেয়নি, তারাই আটকে আছে এই ফাঁদে।

অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশ:
মধ্যম আয়ের দেশের পর এবার অতি ধনী বা ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। ২০১২ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে দেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে যা যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়ে বেশি।

ওয়েলথ-এক্স নামের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান এই তথ্য দিয়ে বলেছে, ‘এটা আশ্চর্যজনক যে ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে চীন বিশ্বের এক নম্বর দেশ নয়। এ অবস্থান বাংলাদেশের।’ গত ৫ সেপ্টেম্বর ওয়েলথ এক্স-এর ‘ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮’ প্রতিবেদনে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বিভিন্ন দেশে সম্পদশালীর সংখ্যা বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরা হয়।

ওয়েলথ এক্সের দাবি, তাদের তথ্যভান্ডারে ১ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি ধনকুবেরের তথ্য রয়েছে। ৩ কোটি মার্কিন ডলার বা ২৫২ কোটি টাকার সম্পদ থাকলে তাঁদের আলট্রা ওয়েলদি বা অতি ধনী হিসেবে গণ্য করে সংস্থাটি।

ওয়েলথ এক্সের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ সালে বিশ্বে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮১০-এ। তাঁদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। সম্পদশালীদের সংখ্যা বেশি বেড়েছে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয়। এশিয়ায় ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে ২৭ শতাংশ।

ধনীরাই আরও বেশি ধনী হচ্ছে:
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১৬ অনুযায়ী, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। বিপরীতে একই সময় সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়, যা ২০১০ সালে ১ হাজার ৭৯১ টাকা ছিল।

এখনো দারিদ্র্যের হার ২৪.৩ শতাংশ:
২০১৬ এর চালানো খানা আয়-ব্যয় জরিপে ছয় বছরে দারিদ্র্যের হার উল্লেখ করা হয়েছে ২৪.৩ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার ১২.৯ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র্যহার ২৬.৪ শতাংশ এবং শহরের দারিদ্র্যহার ১৮.৯ শতাংশ।

২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এই খানা জরিপ চালায় বিবিএস; তার আগের জরিপটি চালানো হয়েছিল ২০১০ সালে। সেই জরিপে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩১.৫ শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ১৭.৬ শতাংশ। তখন গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৫.২ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ২১.৩ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তন আসছে, এটা ঠিক। কিন্তু একটা শ্রেণির হাতে বড় অংশের সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ফলে বৈষম্য অনেক বাড়ছে। দেশে স্বজনতোষী পুঁজিবাদীর কারণে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাংকের মতো ব্যবসা পাচ্ছে সরকারের কাছের লোকেরা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের পরিসর ছোট হয়ে আসছে। এতেই একটা শ্রেণির হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

আরো পড়ুন: 

ডেসটিনি’র ডেসটিনেশন; বর্তমান ও ভবিষ্যত !