হোম কর্পোরেট সুশাসন ডেসটিনি’র ডেসটিনেশন; বর্তমান ও ভবিষ্যত !

ডেসটিনি’র ডেসটিনেশন; বর্তমান ও ভবিষ্যত !

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 8:32 pm
11758
0

মাহমুদ:
২০১২ সালের ১১ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর রাজধানী ঢাকার কলাবাগান থানায় দায়েরকৃত মানি লন্ডারিং মামলায় কারাগারে যান ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন। তারপর থেকেই মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে এখনো কারাবন্দি আছেন ডেসটিনি’র এই শীর্ষ দুই ব্যক্তি।

প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরুর পর থেকে রাজধানী ঢাকার বিজয়নগরস্থ অফিসে ছিল বিপুল কর্মচঞ্চলতা। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনারে দেখা যেত দেশ বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের সরব উপস্থিতি। ডেসটিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ি কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছিল এবং এর ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৪৫ লক্ষ।

Spellbit Limited

২০১২ সালের পর অর্থাৎ ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন এর কারাবরণ এবং একের পর এক মামলার কারণে কর্মচঞ্চল সেই অফিসে এখন সুনশান নীরবতা। বেকার হয়ে পড়েছেন পাঁচ সহ¯্রাধিক কর্মচারি-কর্মকর্তা এবং পুঁজি আটকে যাওয়ায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারী ৪৫ লক্ষ সদস্য ও তাঁদের পরিবার।

কর্পোরেট সংবাদের এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় অন্তত বিশ জন ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারী একাধিক সদস্যর সাথে। তাঁরা হতাশাজড়িত কন্ঠে বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ি যেখানে মানি লন্ডারিং মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা হয় সাত বছর। সেখানে ছয় বছর ধরে জামিনযোগ্য মামলায় বিনাবিচারে কারাগারে আছেন মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন। এর ফলে পথে বসার উপক্রম হয়েছে তাঁদের।

তাঁদের ভাষায়, মামলার গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, খুব সহসাই এর নিষ্পত্তি হবে না। আর যদি নিষ্পত্তি না হয় অর্থাৎ কোম্পানির এমডি ও চেয়ারম্যান মুক্তি না পান তাহলে তাঁদের পুঁজি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

জানা যায়, ২০১৬ সালের ২০ জুলাই হাইকোর্টের ২৮নং আদালত ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন হাইকোর্ট থেকে তাঁদের পাসপোর্ট আদালতে জমার রাখার শর্তে জামিন আদেশ পেয়েছিলেন। কিন্তু জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুদক পক্ষের আইনজীবী এ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম সুপ্রীম কোর্টে প্রধান বিচারপতির আদালতে জামিনের বিরোধীতা করে আপীলের আবেদন করলে তাঁদের জামিনে বের হওয়ার বিষয়টি আটকে যায়।

পরবর্তীতে একই বছরের ১৯ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আপীলেড ডিভিশন নতুন কিছু শর্ত সাপেক্ষে ডেসটিনির শীর্ষব্যক্তিদের জামিনে মুক্তির আদেশ বহাল রাখেন। আদেশে শর্ত দেয়া হয় যে, ছয় সপ্তাহের মধ্যে গাছ বিক্রি করে দুই হাজার আটশত কোটি টাকা দুদকের কাছে জমা দিতে হবে। কিন্তু শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়ে ডেসটিনি কর্তৃপক্ষ আপিল বিভাগে মামলা রায় রিভিউয়ের জন্য আবেদন করে, যা গত ৩০ নভেম্বর ২০১৭ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্জ তা খারিজ করে দেন।

চলতি বছরের ৮ এপ্রিল বিগত ছয় বছর ধরে কার্যত বন্ধ থাকায় ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের মামলার বাইরে থাকা শেয়ারহোল্ডারগণ আদালতে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করার অনুমতি প্রার্থনা করেন। যার পিটিশন নম্বর কোম্পানি মেটার-১৩৪।

কোম্পানি কোর্ট আবেদন আমলে নিলে বিগত ১২ এপ্রিল প্রথম শুনানী শেষে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডকে কেন এজিএম করতে দেয়া হবে না, জানতে চেয়ে আদালত আরজেএসসি-কে রুল ইস্যু করেন। এ সময় আদালত মামলার আদেশ দেয়ার আগে বিবাদী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিষ্টার মাঈনুল ইসলামকে মামলার আরজি পরিবর্তন করে কোম্পানি আইনের ৮১ ও ৮৫ ধারার পরিবর্তে ২৪১ ধারার আলোকে নতুন আবেদন করার জন্য পরামর্শ দেন।

পরবর্তীতে আদালত কোম্পানির এজিএমের অনুমতি না দিয়ে কেন কোম্পানিটির অবসায়ন হবে না তা জানতে চেয়ে মামলার আবেদনকারীদেরকে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করেন। হাইকোর্টের এ আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেন আবেদনকারীরা। আপিল আদেশ না হওয়া পর্যন্স স্থগিত থাকছে এবং এজিএম করার অনুমতির বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আপিল আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে গত ১৮ এপ্রিল ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমিনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কলাবাগান থানার ৩২ ও ৩৩ নম্বর মামলা যা ঢাকার ৫নং বিশেষ আদালতে বিচারাধীন দু’টি মামলা যার নম্বর ১৬/১৭ এবং ১৭/১৭ বা জি.আর ১৩৮ ও ১৩৯ আগামী বছরের ১৮ এপ্রিলের মধ্যে নিম্ন আদালতকে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বর্তমান অবস্থায় ডেসটিনি গ্রুপের ৪৫ লক্ষ ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারীরা তাঁদের পুঁজি ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তারপরও তাঁরা আশা প্রকাশ করেন যে, নিশ্চয়ই একদিন ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন জামিনে মুক্তি পাবেন আর আমরা ফিরে পাবো বিনিয়োগকৃত অর্থ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা এবং কর্মচঞ্চলতা ফিরে আসবে ডেসটিনি গ্রুপে।

আদালতের রায়ে জব্দকৃত ডেসটিনির সম্পত্তির বর্তমান জানতে চাইলে ডেসটিনির বিনিয়োগকারী সদস্য অমিত ভট্রাচার্য্য ডেসটিনির শীর্ষ ব্যক্তিদ্বয়ের মুক্তি দাবি করে বলেন, আদালতের আদেশে ডেসটিনির জব্দকৃত সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, কিছু সম্পদ আবার বেহাত হয়ে যাচ্ছে। ফলে, বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফিরিয়ে দেয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ডেসটিনি’র সকল সম্পদ ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানান তিনি।

ডেসটিনি’র আরেক বিনিয়োগকারী সদস্য মোশারফ হোসেন বলেন, ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীন ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। পুলিশ মানি লন্ডারিংয়ের যে মামলা করেছেন, তা বিগত ছয় বছরেও প্রমাণিত হয়নি। আমরা বিশ্বাস করি, ডেসটিনি’র শীর্ষ ব্যক্তিরা মুক্তি পেলে বিনিয়োগকারীরা তাঁদের সমুদয় বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পাবেন। তাঁদের আটকে রেখে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া সম্ভব না।

ডেসটিনি মাল্টি পারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি’র বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির সাথে সম্পৃক্ত আজম আলী কর্পোরেট সংবাদকে বলেন, সমবায় অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য একাধিকবার সমবায় অধিদপ্তরের দুই জন এবং ডেসটিনি’র তিনজন মোট পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এডহক কমিটি গঠন করলেও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হলে প্রতিষ্ঠানটি তার স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।

নিম্ন আদালতে ডেসটিনি’র বিরুদ্ধে চলমান মামলা সম্পর্কে ডেসটিনি’র অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও নিম্ন আদালতে চলমান মামলার বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত রঞ্জিত চক্রবর্তী কর্পোরেট সংবাদকে বলেন, ডেসটিনি’র বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুটি মামলা প্রতি সপ্তাহে পর্যায়ক্রমে সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা চলছে। আশা করা যাচ্ছে, হাইকোর্টের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যেই নিম্ন আদালতের বিচারিক কার্য সম্পন্ন হবে এবং মামলায় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে আসামীরা বেকসুর খালাস পাবেন।

জব্দকৃত সম্পদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডেসটিনি’র লিগ্যাল টিমের প্রধান সমন্বয়কারী কর্পোরেট সংবাদকে বলেন, ডেসটিনি’র দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অফিসের কোন উর্দ্ধতন কর্মকর্তার উপস্থিতি নেই। ফলে, কোম্পানির সকল দাপ্তরিক কাজে স্থবিরতা বিরাজ করছে।

ডেসটিনি’র বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ডেসটিনি’র ক্রয়কৃত রাজধানীর ১নং পুরানা পল্টন, কালভার্ট রোডের সম্পত্তি, যেখানে নোয়াখালী হোটেল সহ বেশ কয়েকটি হোটেল ও স্থাপনা ছিল, সেটি পুলিশ হেফাজতে নিলেও সেখানে পল্টন থানা পুলিশ কোন সাইনবোর্ড লাগাতে পারেনি। কিন্তু সম্প্রতি সেখানে অন্য একটি পক্ষ সকল স্থাপনা উচ্ছেদ করে বহুতল ভবন নির্মাণ করার জন্য বাউন্ডারি দিয়েছে। হয়তো একদিন বহুতল ভবন হয়েও যাবে। আর এটা হলো ডেসটিনি’র জব্দকৃত সম্পদের বর্তমান অবস্থার একটা নমুনা।

তিনি আরো বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্রেতা, পরিবেশক ও বিনিয়োগকারীর একটি অংশ নিজস্ব অর্থায়নে এবং সার্বিক সহযোগিতায় এখনো কোম্পানির অফিস খুলছে, লোক সমাগম হচ্ছে-ভবিষ্যতে হয়তো ভাল কিছু হবে এই আশায়।

কালভার্ট রোডের জমির বিষয়ে জানতে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে একাধিকবার ফোন করেও কোন মন্তব্য জানা যায়নি।

ডেসটিনি’র বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী ব্যারিস্টার মাঈনুল হোসেন কর্পোরেট সংবাদকে বলেন, সম্প্রতি ডেসটিনির জব্দকৃত সম্পদের মধ্যে রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত আনন্দ ও ছন্দ সিনেমা হল নিয়ে হাইকোর্ট একটি রায় দিয়েছেন। সেখানে আগে যেখানে রিসিভার হিসেবে শুধু পুলিশ কমিশনার দেখভাল করতেন, এখন রায়ের আলোকে পুলিশ কমিশনারের সাথে ডেসটিনি’র এক উর্দ্ধতন কর্মকর্তা সিনেমা হল দু’টির তদারকি করবেন। এবং নতুন একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হবে যেটি পুলিশ কমিশনার এবং ডেসটিনি’র উর্দ্ধতন কর্মকর্তার যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে। রায়টি বাস্তবায়নাধীন আছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, পর্যায়ক্রমে ডেসটিনি’র সকল সম্পদ কোম্পানির অনুকূলে আসবে।

ডেসটিনি’র কারাবন্দি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানের মুক্তির ব্যাপারে বলেন, বিষয়টি নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে আইনগতভাবে আমাদের জোড়ালো প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

আরো পড়ুন: ভার্চুয়াল ভাইরাস, ক্ষতিকর দিক ও প্রতিকার