হোম কর্পোরেট সুশাসন ফাইন্যান্সিয়াল অডিট বনাম কমপ্লায়ান্স অডিট

ফাইন্যান্সিয়াল অডিট বনাম কমপ্লায়ান্স অডিট

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 6:09 pm
5263
0
sir

মো: মিজানুর রহমান: একবার মাকে নিয়ে এক ডাক্তার বন্ধুর পরামর্শে অন্য এক অধ্যাপক ডাক্তার সাহেবের কাছে গেলাম। তিনি বাংলাদেশের একটি বড় হাসপাতালে বসেন। এক সময় ঢাকা মেডিকেলে ছিলেন। ভালো ডাক্তার হিসেবে অনেক নাম-ডাক। সপ্তাহখানেক রোগ পর্যালোচনা শেষে ডাক্তারবাবু চিকিৎসার যে নির্দেশনা দিলেন তাতে রোগীর একটি বড় ধরনের সার্জারি প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে একজন ঐ ডাক্তারের সার্জারি বিষয়ক পারদর্শিতা সম্পর্কে জানতেন এবং তিনি আমাকে বললেন, যেভাবেই হোক এই ডাক্তারকেই সার্জারি করানোর জন্য রাজি করাতে হবে। ফলে আমি অধ্যাপক সাহেবকে করজোড় অনুরোধ করলাম। পীড়া-পীড়ি করায় ডাক্তারবাবু বললেন, আমার বয়স হয়েছে, তাছাড়া একজন জেনারেল সার্জন ছিলাম আর এখন আমি ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ সার্জন এবং অধ্যাপক। এক সময় সব ধরনের সার্জারি করতাম। কারণ, সে সময় সার্জারি বিষয়ে এত বিভাগ ছিল না। এখন সার্জারিতে অনেক বিভাগ হয়েছে এবং স্ব স্ব বিভাগে বিশেষজ্ঞ সার্জন দ¦ারা সার্জারি করার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞ সার্জন এর কাজ আমি জেনারেল সার্জন হিসেবে কেন করব? যদি বিভাগীয় বিশেষজ্ঞদের কাজ করার সুযোগ না হয় তাহলে বিশেষায়িত বিশেষ বিভাগ থাকার কোন গুরুত্ব থাকবে না। আমি যার কাছে যেতে বলেছি তিনি আপনাদের রোগীর রোগ নিরাময়ের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং অধ্যাপক। সার্জারি বিষয়ে যার কাজের শতভাগ সফলতা রয়েছে। আপনারা খামাখা ভয় পাচ্ছেন। ডাক্তারের কথা শুনে আমি রাগবো না কাঁদবো বোঝার জন্য একদিন সময় নিলাম। এদিকে রোগীর অবস্থা খুব খারাপ, যত শীঘ্র সম্ভব ওটিতে নেয়া দরকার। পরের দিন আমি আমার গুরুজন পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে বিষয়টি জানালাম। তিনি সব শুনে আমাকে বললেন, ডাক্তার সাহেব তোমাকে খুবই সঠিক বলেছেন। কারণ, এক সময় আমরা চাটার্ড এ্যাকাউন্টেন্টরা ফাইনান্সিয়াল অডিটের পাশাপাশি জেনারেল সার্জনের মত সব কাজ করতাম কিন্তু এখন করি না। কারণ, এখন কর্পোরেট এরিনায় স্ব স্ব বিভাগীয় প্রফেশনাল এবং প্রফেশনাল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের যেমন উচিৎ সব কাজ নিজেরা না করে বিশেষ কাজ নির্দিষ্ট প্রফেশনালদের তত্বাবধানে করানো, ঠিক তেমনি অধ্যাপক ডাক্তার তোমাকেও সঠিক নির্দেশনা দিয়েছেন। উনি যেখানে যেতে বছেলেন তোমার মাকে সেই ডাক্তারের কাছেই নিয়ে যাও। পরের দিন ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক মায়ের সার্জারি করালাম এবং আল্লাহপাকের অশেষ রহমতে তিনি এখনও সুস্থ আছেন। ঐ ডাক্তার বাবু এবং আমার ঐ প্রিয় স্যারকে হাজার সালাম। আপনারাই প্রকৃত প্রফেশনাল।

কমপ্লায়ান্স বা সেক্রেটারিয়াল অডিট কারা করবে সেটা বোঝার জন্যই বাস্তব ঘটনাটির অবতাড়না। যাঁরা কর্পোরেট প্রফেশনাল হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় কাজ করছেন, ভবিষ্যতেও কাজ করবেন এবং যাঁরা কাজ করার সুযোগ দিচ্ছেন, কাজ দিচ্ছেন ও কাজের ক্ষেত্র তৈরি করছেন তাদের কিছুটা চিন্তার খোরাক হিসেবেই আমার আজকের এ লেখা।

Spellbit Limited

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তাদের সংশোধিত কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড ২০১৮ এর সেকশন ৯ (নয়) এ কর্পোরেট গভর্নেন্স কমপ্লায়ান্স সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রে সকল প্র্যাকটিসিং প্রফেশনাল ফার্মের জন্য সমান সুযোগ রেখেছে। এর আগে ২০১২ সালে প্রথম এসইসি কর্তৃক একইভাবে কমপ্লায়ান্স অডিট করার জন্য নির্দেশনা দেয়।

প্রশ্ন হলো, বিএসইসি যে সকল প্রফেশনাল একাউন্টিং বা সিএ ফার্মকে দিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ফাইনান্সিয়াল অডিট করানো ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন, সে সকল সিএ ফার্মকে দিয়েই আবার কমপ্লায়ান্স অডিট বা কর্পোরেট গভর্নেন্স অডিট করানোর সুযোগ রাখার বিষয়টি কতটুকু যৌক্তিক? যেখানে ‘চাটার্ড সেক্রেটারি’ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক চাটার্ড সেক্রেটারিজ এ্যাক্ট-২০১০ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পেশা। চাটার্ড সেক্রেটারিজ এ্যাক্ট-২০১০ দ্বারা চাটার্ড সেক্রেটারি সদস্যদের পেশাগত প্রধান কাজ কোন বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে সেক্রেটারিয়াল-কমপ্লায়ান্স রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেক্রেটারিয়াল-কমপ্লায়ান্স অডিট বা নিরীক্ষা করা।

একজন আইনজীবীর প্রধান কাজ আদালতে প্র্যাকটিস বা বিচারকের সামনে দাঁড়ানো। তিনি কখনও বিবাদীর পক্ষে আবার কখনও বাদীর পক্ষে কথা বলেন যুক্তি তর্কের মধ্য দিয়ে একটি মামলায় সত্য ও সঠিক বিচারিক কাজে আদালতকে সহযোগিতা করেন, এটাই তার পেশা। পাশাপাশি আইনজীবী হিসেবে জীবিকা নির্বাহের জন্য আইন পেশা সংশ্লিষ্ট অন্য কাজও করে থাকেন। একজন ডাক্তার, যাঁর প্রধান পেশা হাসপাতালে, ক্লিনিকে বা নিজের কর্মস্থলে অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা দেয়া। পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য ডাক্তারি পেশা সংশ্লিষ্ট অন্য কাজ করা। একজন প্রকৌশলী, কর্মস্থলে যার প্রধান পেশা প্রকৌশল সংক্রান্ত বিষয়ে পেশাগত কাজ করা এর পর অন্য কিছু। একজন চাটার্ড এ্যাকাউন্টেন্ড, যার পেশাগত প্রধান কাজ কোন প্রতিষ্ঠানের হিসাব রক্ষণ এবং আর্থিক নিরীক্ষা করা। পাশাপাশি হিসাববিদ হিসেবে জীবিকা নির্বাহের জন্য হিসাব রক্ষণ ও নিরীক্ষণ পেশা সংশ্লিষ্ট অন্য যেকোন কাজ করা। উপরোক্ত কোন পেশার শুরুতেই সম্ভবত শত শত পেশাজীবী পেশাগত সেবা ও সার্ভিস দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আইনের বাধ্যবাধকতা ও প্রয়োজনের তাগিদে সকল পেশায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পেশাজীবীর জন্ম নিয়েছে। এ বিষয়ে নিশ্চয় কেউ বিতর্কে যেতে চাইবেন না। যদি তাই হয়, তাহলে কমপ্লায়ান্স অডিট বা সেক্রেটারিয়াল অডিট পেশাগত দিক থেকে বিবেচনা করলে চাটার্ড সেক্রেটারি সদস্যদেরই করার কথা। কারণ, চাটার্ড সেক্রেটারিজ এ্যাক্ট-২০১০ মোতাবেক চাটার্ড সেক্রেটারি সদস্যদের পেশাগত প্রধান কাজ কোন বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে সেক্রেটারিয়াল-কমপ্লায়ান্স রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেক্রেটারিয়াল-কমপ্লায়ান্স অডিট বা নিরীক্ষা করা। ‘চাটার্ড সেক্রেটারি’ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক চাটার্ড সেক্রেটারিজ এ্যাক্ট-২০১০ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পেশা। কিন্তু পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ (বিএসইসি) বার বার চাটার্ড সেক্রেটারি প্রফেশনের কাজ কেন চাটার্ড এ্যাকাউন্টেন্ড প্রফেশনের এখতিয়ারের মধ্যে রেখে তাঁদেরকে দিয়ে করাতে চাচ্ছেন বিষয়টি পরিস্কার না। যদি সব কাজই সিএ প্রফেশনের লোকদের করতে দেয়া হয় তাহলে ফাইনান্সিয়াল অডিট করার ক্ষেত্রেও সিএমএ প্রফেশনের সদস্যদের এখতিয়ার দিলে ক্ষতি কী? সিএমএ প্রফেশনের সদস্যরাও তো পেশাগত হিসাববিদ এবং আর্থিক নিরীক্ষা করার যোগ্যতা রাখে। বলা হচ্ছে চাটার্ড সেক্রেটারি প্রফেশনের পেশাগত ফার্মের সংখ্যা খুবই কম, ফলে এখনই তারা পেশাগতভাবে পুঁজিবাজারের তালিকাভূক্ত সকল কোম্পানিতে সেক্রেটারিয়াল বা কমপ্লায়ান্স অডিট সার্ভিস দিতে পারবে না । প্রশ্ন হল, যখন সকল প্রতিষ্ঠানের ফাইনান্সিয়াল অডিট কোম্পানি আইন-১৯৯৪ এ বাধ্যতামূলক করা হয় তখন কী বাংলাদেশে শত শত সিএ ফার্ম ছিল? নাকি আস্তে আস্তে আইনি বাধ্যবাধকতায় প্রয়োজনের তাগিদে শত শত সিএ ফার্মের জন্ম হয়েছে। মোদ্দা কথা হলো, আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে প্রয়োজনের তাগিদে সিএ প্রফেশনের ফার্মের মত সিএস প্রফেশনের ফার্মের সংখ্যাও বাড়বে।

সুতরাং, সবার আগে প্রয়োজন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিএসইসি) এর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং সিএস পেশাগত সদস্য ফার্মের কাজের ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ। তাহলেই দেখা যাবে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে সিএস প্রফেশনের পেশাগত ফার্মের সংখ্যা। পাশাপাশি চাটার্ড সেক্রেটারি ইন্সটিটিউট (আইসিএসবি) এর বর্তমান কাউন্সিলকে এ ক্ষেত্রে রাখতে হবে অগ্রনী ভূমিকা। যেভাবে ‘আইসিএসবি’র কাউন্সিল ২০১০ সালে চাটার্ড সেক্রেটারিজ এ্যাক্ট পাশের মাধ্যমে চাটার্ড সেক্রেটারিজ প্রফেশনের স্বীকৃতি আদায় করেছিল। বিএসইসি’কে বোঝাতে হবে চাটার্ড সেক্রেটারি প্রফেশনের কাজ এবং পেশাদারিত্ব সম্পর্কে। বিএসইসি যদি এখনই চাটার্ড সেক্রেটারি প্রফেশনকে কমপ্লায়ান্স বা সেক্রেটারিয়াল অডিট এর ক্ষেত্রে আইনানুগ স্বীকৃতি না দেয়. তাহলে নতুন কোম্পানি আইনে চাটার্ড সেক্রেটারি প্রফেশনকে পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। আইসিএসবি’র বর্তমান কাউন্সিল যদি মনে করে চেষ্টা তদবির ছাড়াই তাঁদের পেশাগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তাহলে তাঁরা বড় ধরনের ভূল করবে এবং অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাবে। যেমনটি হয়েছিল চাটার্ড সেক্রেটারিজ এ্যাক্ট-২০১০ জাতীয় সংসদে পাশ হওয়ার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত। দুষ্টু বন্ধুকে দিয়ে রুটি ভাগের গল্প আমরা সবাই কম বেশি জানি। কাজেই আইসিএসবি’র প্রকৃত বন্ধু কাউন্সিলদের এই প্রফেশনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। বর্তমান কাউন্সিলকে সিএস পেশাগত ফার্ম এর সংখ্যা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সিএস প্রফেশনের ব্র্যান্ডিং এর জন্য বিএসইসি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্রফেশনের উন্নয়নমূলক সভা-সেমিনার বেশি বেশি করতে হবে। প্রকৃত বন্ধুদের দিয়ে একটি টিম করে বিএসইসি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড ও কোম্পানি আইনে সিএস প্রফেশনকে সঠিকভাবে অন্তর্ভূক্তির জন্য কাজ করতে হবে।

প্রফেশনের দুষ্টু বন্ধুকে দিয়ে চাটার্ড সেক্রেটারি সদস্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে তা হবে সেই রুটি ভাগ করার মত। যেমনটি ঘটেছে চাটার্ড সেক্রেটারিজ সদস্যদের আইটিপি হিসেবে কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে। সুতরাং, আইসিএসবি’র বর্তমান কাউন্সিল; ৩২শে না হলে ৭২এও হবে না, বিএসইসি না করলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও কোম্পানি আইনে করবে না। ২০০৯-২০১০ এর মত চাটার্ড সেক্রেটারি প্রফেশনের বিরোধীরা এখনও তৎপর। তারা ফাইন্যান্সিয়াল অডিট বনাম কমপ্লায়ান্স অডিট দুই দলেই খেলতে চায় আবার জিততেও চায়। সবই তাদের, অন্য প্রফেশনকে তারা মানতেই চায় না। আর এই দুই টিমের খেলায় রেফারির ভূমিকায় বিএসইসি।

ইংল্যান্ড, ইন্ডিয়া, মালয়েশিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, কেনিয়া সহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশেও কর্পোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার চাটার্ড সেক্রেটারি প্রফেশনের জন্য চাটার্ড সেক্রেটারিজ আইন ২০১০ এর মাধ্যমে একটি প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম ইনস্টিটিউট অব চাটার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি)। ইনস্টিটিউট এর বর্তমান সদস্য প্রায় পাঁচশত যাদের মধ্যে ২৭ জন সদস্যের প্র্যাকটিসিং প্রফেশনাল ফার্ম আছে। এর মধ্যে ১৯টি সিএ ফার্ম, ১টি সিএমএ ফার্ম ও ৭টি সিএস ফার্ম আছে। এ সব ফার্মে শতাধিক প্র্যাকটিসিং প্রফেশনাল একাউন্ট্যন্ট, কষ্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউনটেন্ট এবং চাটার্ড সেক্রেটারি কাজ করেন যাঁদের প্রত্যেকেরই অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত।

চলতি বছরে ২০১৮ সালে এ পর্যন্ত যতগুলো তালিকাভুক্ত কোম্পানির এজিএম হয়েছে, তাদের বাৎসরিক রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, কমপ্লায়ান্স সার্টিফিকেট যারা দিয়েছেন তাদের ৯৯ শতাংশই বিএসইসি এর তালিকায় বাদ পড়া সেই সব সিএ ফার্ম। অর্থাৎ, যে সব সিএ ফার্মকে বিএসইসি তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিরীক্ষকের তালিকা করার সময় বিবেচনার বাইরে রেখেছে তারাই। পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানির বাৎসরিক আর্থিক নিরীক্ষা যে সকল সিএ ফার্ম করছে তারাই তালিকায় বাদ পড়া সিএ ফার্মকে দিয়ে কম ফিস এর বিনিময়ে নামে বেনামে কমপ্লায়ান্স সার্টিফিকেট করিয়ে নিচ্ছেন। তাঁরা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে বুঝাচ্ছেন, অযথা কেন কোম্পানি বেশি টাকা খরচ করবে, আমরাই অন্য কোন সিএ ফার্মকে দিয়ে স্বল্প টাকা ফি দিয়ে কাজ করিয়ে দিতে পারি। কোম্পানির কর্তা ব্যক্তিরাও তখন অল্প চাপে বেশি পানির জন্য রাজি হয়ে যান। ফলে, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পালন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যে উদ্দেশ্যে কমপ্লায়ান্স সার্টিফিকেট দেয়ার বাধ্যবাধকতা করা হলো সে উদ্দেশ্যই আর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

পূঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরিচালনা পর্যদ সিএ ফার্ম এর সাথে কাজ করতে বেশি আগ্রহী। কারণ জানতে চাইলে কোম্পানির পক্ষ থেকে জাননো হয় যে, সিএ ফার্মের সাথে কাজ করলে কোম্পানির বোর্ড যা চায়, যেভাবে চায়, তাঁরা তা করতে পারেন এবং করেও দেয়। পক্ষান্তরে, অন্য প্রফেশনের প্র্যাকটিসিং ফার্ম কাজের ক্ষেত্রে অযথা ভাব দেখায় আবার বেশি ফি চায় এবং কাজের ক্ষেত্রে জটিলতাও তৈরি করে। ফলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় থাকা কর্তা ব্যক্তিরা যেমন এমডি, সিএফও এবং সিএস তাঁদের কাজের সুবিধার কথা চিন্তা করে পরিচালনা পর্ষদের সন্তুষ্টির জন্য আবার সেখানেই ফিরে যান, তাদেরকেই কোম্পানির কমপ্লায়ান্স সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য নিয়োগ দেন। এজিএম এ নিয়োগ দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কার্যত শেয়ার হোল্ডারদের তেমন কোন ক্ষমতা নেই। কারণ, এজিএম পার্টি দিয়ে কর্তৃপক্ষ সব ইয়েস ইয়েস বলে পাশ করিয়ে নেয়। অর্থাৎ নিয়োগের ক্ষমতা সেই বোর্ডের হাতেই। কাজেই এমডি ও চেয়ারম্যান এর পছন্দের বাইরে কারো নিয়োগ পাওয়ার কোন সুযোগ নেই।

দেশে শতাধিক সিএ ফার্ম থাকলেও অনেক সিএ ফার্মের উইন্ডো ড্রেসিং কাজের কারণে বাংলাদেশের প্রইভেট সেক্টর, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেশন ও সোসাইটি অর্থনৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ। আর এর দায়ভার পড়ছে পুরো সিএ প্রফেশনের উপর। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গা তৈরি করার জন্য কমপ্লায়ান্স অডিট এবং সার্টিফিকেশনের জন্য একটি আলাদা প্যানেল অফ কমপ্লায়ান্স অডিটর থাকা অতি আবশ্যক যা বর্তমান সরকার এবং এ সময়ের জোড়ালো দাবি। ভালো চিন্তা ও ভালো কাজ খুব ভালো পেশাদািরত্ব ছাড়া কখনও সম্ভব হয়নি এবং হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। সুতরাং, শুধু নির্দেশনা দিয়ে দায়ভার অন্যের ঘাড়ে চাপালেই ভালো কাজ পাওয়া যায় না। ভালো কাজের নির্দেশনা হতে হবে সুনির্দিষ্ট ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে, যেমনটি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আছে এবং যা আমাদের দেশের বর্তমান সরকারও চায়।

পুঁজিবাজারের তালিকাভূক্ত কেম্পানির ফাইন্যান্সিয়াল অডিটের জন্য যেমন ৪০টি সিএ ফার্মের সমন্বয়ে একটি অডিটর প্যানেল গঠন করা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে কর্পোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রেও ২৭ জন চাটার্ড সেক্রেটারি (সিএস) প্রফেশনাল সদস্যের ফার্মকেও প্যানেলভুক্ত করে কমপ্লায়ান্স অডিটর এর একটি প্যানেল যদি বিএসইসি কর্তৃক চূড়ান্ত করে দেয়া হয়, তাহলে কর্পোরেট সেক্টরে গুড গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠায় এটি একটি মাইল ফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। বিএসইসি প্যানেলভুক্ত ৪০টি সিএ ফার্ম দ্বারা যদি তালিকাভুক্ত সকল কোম্পানির ফাইন্যান্সিয়াল অডিট করা যায় তাহলে কমপ্লায়ান্স অডিট বা সার্টিফিকেশন এর কাজটিও বিদ্যমান ২৭ জন সিএস প্রফেশনাল এবং প্র্যাকটিসিং ফার্ম দিয়েও শুরু করা যেতে পারে, পরে সিএস ফার্ম এর সংখ্যা আরও বাড়বে। সুতরাং, কর্পোরেট সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। যাতে পুরনো বোতলে নতুন পানীয় না ঢোকে। তাছাড়া কমপ্লায়ান্স অডিট বা সার্টিফিকেশনের কাজের ক্ষেত্রটি যদি চাটার্ড সেক্রেটারি প্রফেশনের জন্য এখনি নির্দিষ্ট করে না চাওয়া হয় বা নির্দিষ্ট করে না দেওয়া হয় তবে নতুন কম্পানি আইন প্রনয়নের ক্ষেত্রেও দেখা দেবে জটিলতা। অর্থাৎ, সেখানেও সেক্রেটারিয়াল অডিট বা কমপ্লায়ান্স অডিট বা কমপ্লায়ান্স সার্টিফিকেশন যে নামেই বলা হোক না কেন চাটার্ড সেক্রেটারি প্রফেশনের জন্য নির্ধারিত পেশা সুনির্দিষ্টভাবে বলা নাও থাকতে পারে। ফলে, এখনি সময় পেশাদারিত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার এবং সে জন্য দরকার কাজের ক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র ও চাটার্ড সেক্রেটারি পেশার কাজের সুনির্দিষ্ট সুযোগ। তা না হলে চাটার্ড সেক্রেটারিরা তাদের পেশাদারিত্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন কীভাবে?

২৭টি সিএস সদস্যের ফার্মের তালিকা জানতে ক্লিক করুন

কর্পোরেট সংবাদে আরও পড়ুন:
যোগ্যতা ছাড়াই সিএফও এবং সিএস নিয়োগ বাধ্যতামূলক!
স্বামীর দেয়া কোনো উপহার স্ত্রীর দেনমোহর নয়
মহানায়ক মুজিবের বর্ণাঢ্য পরিচিতি