হোম কর্পোরেট সুশাসন “পড়ালেখা করে যে, গাড়ির তলায় মরে সে”

“পড়ালেখা করে যে, গাড়ির তলায় মরে সে”

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 6:50 pm
367
0
গাড়ির তলায় মরে

মো. মাহমুদুন্নবী জ্যোতি: অফিসের একটি কাজে আজ মতিঝিল গিয়েছিলাম। অফিস থেকে বের হয়ে দেখি মুষুলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। যেতেই হবে, তাই রিক্শায় পলাশকে সাথে নিয়ে বসি। জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে যেতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের মিছিল চোখে পড়ে। ওরা বলছে, “পড়ালেখা করে যে, গাড়ির তলায় মরে সে”। থমকে দাঁড়ালাম। কি অদ্ভূত, “পড়ালেখা করে যে, গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে” বাল্য শিক্ষা বইয়ের উৎসাহমূলক ছড়াটি আজ ওদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে ভয়ঙ্কর এক আশঙ্কার কথা জুড়ে দিয়েছে।

শিক্ষার্থীরা প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে গাড়ির ড্রাইভারদের লাইসেন্স পরীক্ষা করছে। আমি জনতা ব্যাংকের এমডি সাহেবের কক্ষ থেকে বেরিয়ে ভবনের নিচে আসি সোয়া একটার দিকে। বৃষ্টি তখন কমে এসেছে। দেখি ছেলেরা একজন গাড়ি চালকের কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্স চাচ্ছে। পিছনে বসা ভদ্রলোক নিজেকে প্রফেসর দাবি করে বেশ ঝাঁঝালো আচরণ করছে। কিন্তু ১৩-১৪ বছরের ছেলের অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলছে স্যার, শুধু ড্রাইভারকে বলেন লাইসেন্স দেখাতে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই প্রফেসরের গাড়ির চালকের কোন ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। ভদ্রলোক গাড়ি থেকে বেড়িয়ে ড্রাইভারকে বাসা থেকে লাইসেন্স আনতে বলে নিজে সটকে পড়ে। সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর একজন শিক্ষার্থী বলল, দেখেন, প্রফেসর আমাদের নীতি নৈতিকতা, আইন-কানুন মান্য করার শিক্ষা দেয়, অথচ তার এই অবস্থা।

Spellbit Limited

জনতা ব্যাংক ভবনের পশ্চিম দিকে হাঁটছি পল্টনের উদ্দেশ্যে। দৈনিক বাংলা মোড়ে এসে চক্ষু ছানাবড়া। একজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তার গাড়ি আটকে দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলছে, স্যার, ড্রাইভারকে বলেন লাইসেন্স দেখাতে। কর্মকর্তা গাড়ির ভিতরে বসে বেশ গম্ভীর স্বরে বললেন, এটা কি তোমাদের কাজ? ছেলেটি বলল, যাদের কাজ তাঁরা তো পালন করছেন না। আপনার গাড়ি চালকের হাতে যে আমার প্রাণটা যাবে না, তার গ্যারান্টি কি আপনি দিতে পারবেন? অফিসার বললেন, কোথায় পড়? একজন বারো-তের বছরের শিক্ষার্থী খিলগাঁও আইডিয়াল স্কুলের আইডি তুলে ধরে। সেনা কর্মকর্তা নিজের দামি মোবাইলে ছুবি তুললেন। পড়ে এক ট্রাফিক কনস্টবল ছেলেটিকে বুঝিয়ে সেখান থেকে নিয়ে গেল।

অফিসে এসে টিভি খবরে দেখলাম দেশজুড়ে বাচ্চারা আন্দোলন করছে। ফেসবুকে দেখলাম একজন মন্ত্রীর গাড়ি চালকের লাইসেন্স নেই। তিনি গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে অন্য গাড়িতে চড়লেন। পুলিশ কমিশনারের গাড়ির চালকের লাইসেন্স নেই। ভাবতেই অবাক লাগে, যাদের কাছে দায়িত্ব গাড়ি চালকের লাইসেন্স দেয়া, তা পরীক্ষা করা, নিয়মিত মনিটরিং করা, অথচ তাদের গাড়ির চালকদেরই লাইসেন্স নেই।

বড়ই বিচিত্র এক আন্দোলন দেখছি আমরা। সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু শিক্ষার্থীরা না। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ মারা যাচ্ছে অদক্ষ বাস চালকের হাতে। কিন্তু পরিবহণ মালিক আর শ্রমিকদের দৌরাত্মের কারণে কেউ-ই কোন প্রকার প্রতিকার গড়ে তুলতে পারেননি। গড়ে তুললো কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। অভিভাবক হিসেবে নিজেকেই ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে। আমরা আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে একটি সুন্দর নিরাপদ সড়ক দিতে পারিনি। একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার প্রত্যয় যাঁদের চোখে মুখে, তাঁদের চোখে আজ আতঙ্কের রেখা। বৃষ্টি উপক্ষো করে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে নিজেদের নিরাপদ রাখার তাগিদে।

প্রত্যাশা করি, ওদের সেই স্লোগান “পড়ালেখা করে যে, গাড়ির তলা মরে সে” ভুলে যাক। নিরাপদ হোক ওদের জীবন। গড়ে তুলুক এ দেশকে পৃথিবীর বুকে অনন্য এক নিরাপদ দেশ হিসেবে।

আরও পড়তে পারেন: 

কিশোর অপরাধ ও আমার কিছু ভাবনা