হোম আর্কাইভ ইমরান খান: ক্রিকেট অধিনায়ক থেকে দেশের অধিনায়ক

ইমরান খান: ক্রিকেট অধিনায়ক থেকে দেশের অধিনায়ক

সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে : at 10:40 am
397
0
ইমরান খান

মন্তব্য প্রতিবেদন: ইমরান খান বিশ্বক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। তার অধিনায়কত্বে পাকিস্তান ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জয় করে। ১৯৫২ সালের ২৫ নভেম্বর পাঞ্জাবের শাহিওয়ালে জন্মগ্রহণ করা ইমরান খান নিয়াজি খেলোয়াড় জীবন শেষে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। 

দুর্নীতিবিরোধী স্লোগানে ১৯৯৬ সালের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠা করেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ। পরের বছর ১৯৯৭ সালে তিনি নির্বাচনে দুটি কেন্দ্র থেকে দাঁড়ালেও দুটিতেই হেরে যান। তবুও থেমে যাননি তিনি। ২০০২ সালে নির্বাচনে জয়ী হন ইমরান খান। ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট হয়ে জেনারেল পারভেজ মোশারফ তৎকালীন সেনাপ্রধানের পদে থেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। ইমরান খান ওই নির্বাচনের বিরোধিতা করে ওই বছরের ২ অক্টোবর ৮৫ জন পার্লামেন্ট সদস্যের সঙ্গে পদত্যাগ করেন। সেবারের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হয়ে মোশারফ পাকিস্তানে জরুরি অবস্থা জারি করেন। ইমরান খানকে গৃহবন্দি করা হয়।

Spellbit Limited

ওই সময় তিনি কিছুদিন হাজতবাসও করার পর মুক্তি পান। ২০১৩ সালে পাকিস্তানের দশম নির্বাচনে তরুণ ও মধ্যবিত্তের ভোট পেয়ে ইমরান খানের দল পার্লামেন্টের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়ে যায়। আর ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই পাকিস্তানের ১১তম জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হয়। শেষ মুহূর্তে সেনাসদর কোনো কারণে বিরাগভাজন না হলে ইমরান খানই হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের ১৯তম প্রধানমন্ত্রী।

এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি হচ্ছেন ‘সম্ভ্রান্ত এবং ঐতিহ্যবাহী পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি’র বাইরে থেকে আসা প্রথম প্রধানমন্ত্রী।

বদলে যাওয়া ইমরান খান:
ইমরান খান তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্লেবয় খ্যাতি বাদ দিয়ে রাজনীতির মাঠে কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। স্যুট-বুট ছেড়ে এখন তিনি পাঞ্জাবি-পায়জামা (সালোয়ার-কামিজ) পরেন। তিনি অতীতে যা যা করেছেন তার উল্টোপথে হেঁটেছেন। কথা বলছেন পুরোদস্তুর কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিকের মতো। ধর্মের নামেও রাজনীতি করায় তিনিও পিছিয়ে ছিলেন না।

বিপরীতমুখী দুই পক্ষ মোল্লা-মাওলানা ও পীরদের সমর্থনও তিনি আদায় করেছেন। ইমরান খান নিজেকে ব্র্যান্ডিং করেছেন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘সৎ রাজনৈতিক’ হিসেবে। ভক্তদের কাছে তিনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি পাকিস্তানের জন্য ‘একমাত্র আশা’। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পরিবর্তন আনবেন। শিক্ষা আর স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটাবেন, তরুণদের জন্য সৃষ্টি করবেন কর্মসংস্থান। এই তরুণরাই ইমরানের প্রধান সমর্থক এবং পাকিস্তানের জনসংখ্যার তারা ৬৪ শতাংশ। সমর্থকদের কাছে ইমরান খান রাজনীতিবিদের পাশাপাশি একজন মানবপ্রেমিকও।

ক্যানসারের তিনটি হাসপাতাল স্থাপন করেছেন। তার অর্থনৈতিক অবস্থা পিএমএল-এন প্রতিষ্ঠাতা নওয়াজ শরিফ এবং তার পরিবারের মতোই। নওয়াজের পরিবারের মালিকানায় রয়েছে দেশটির একাধিক বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

ইমরান খান দেশটির জনগণকে ‘নয়া পাকিস্তান’ (নতুন পাকিস্তান)-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর জন্য ২২ বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। আর অনেকেই এতে আশাবাদী। কারণ খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে তার দলের সরকার পাঁচ বছরে সাফল্যর সঙ্গে জনকল্যাণে কাজ করেছে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা বেড়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়েছে। ইমরান খান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পরিবর্তন আনবেন। তিনি তার সমর্থকদের বলে আসছেন, পাকিস্তানে চাকরি সৃষ্টি করতে হলে এবং সেবা খাতকে উন্নত করতে হলে দেশে পিপিপি আর পিএমএল-এনে যে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি চলছে তার অবসান ঘটাতে হবে। দুর্নীতিবাজ নেতাদের ধরতে হবে এবং লুকানো সম্পদ বের করে আনতে তাদের বাধ্য করতে হবে।

পাঁচে পাঁচ: পাকিস্তানের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অনানুষ্ঠানিক ফলে কয়েকটি বিস্ময়কর ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে। বড় বড় নেতাকে ভোটে হোঁচট খেতে দেখা গেছে নিজেদেরই শক্ত ঘাঁটিতে আর পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে পাঁচটিতেই জিতেছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ইমরান খান। যদিও বেশিরভাগ দলই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেছে। তার আসনগুলো হলো এনএ-৩৫ (বান্নু), এনএ-৫৩ (ইসলামাবাদ-২), এনএ-৯৫ (মিয়ানওয়ালি-১), এনএ-১৩১ (লাহোর-৯) ও এনএ-২৪৩ (করাচি পূর্ব-২)।

ইমরানের পর সবেচেয়ে বেশি আসনে নির্বাচন করেছিলেন নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই শাহবাজ শরিফ। তিনি তাদের পরিবারিক নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শাহবাজ মোট চার আসনে নির্বাচন করে তিনটিতে হেরেছেন। জয় পেয়েছেন শুধু একটি আসনে। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল জারদারি ভুট্টো এবারই প্রথম প্রার্থী হয়েছেন। তিনি তিনটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। জিতেছেন মাত্র একটিতে।

নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতে নির্বাচন করেও জামিয়াত উলেমা-ই-ইসলাম ফজল (জেইউআই-এফ) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানও হেরে গেছেন। আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি (এএনপি) প্রধান আসফান্দিয়ার ওয়ালি খানও নিজ এলাকায় পিটিআই প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন। এবারের নির্বাচনে হেরে যাওয়া আরেক প্রভাবশালী নেতা চৌধুরি নিসার আলি খান। ১৯৮৫ সাল থেকে পাকিস্তানের সবগুলো সংসদের সদস্য ছিলেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শহিদ খাকান আব্বাসিও দুই আসনের দুটিতেই হেরে গেছেন।

সামনের কঠিন পথ: ইমরান খানের প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ হলো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা। কারণ তাকে সমালোচক ও প্রতিদ্বন্দ্বীরা দেখেন পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর এস্টাব্লিশমেন্টের একজন ‘প্রক্সি’ হিসেবে। বিশ্লেষকদের মতে, কিছুদিনের মধ্যে ইমরান খান দেখতে পাবেন যে, তিনি সামরিক এস্টাব্লিশমেন্টের সঙ্গে একটা সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। তার দুই পূর্বসূরির ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছে।

বিয়ে: ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া ইমরান খানকে একসময় পশ্চিমের সাংবাদিক-বিশ্লেষকরা দেখতেন অক্সফোর্ডে পড়া একজন রমণীমোহন প্লেবয় হিসেবে; যিনি ক্রিকেট যেমন বুঝতেন, তেমনই চিনতেন লন্ডনের নাইটক্লাবগুলো। কিংবদন্তি ক্রিকেটার ইমরান খান বিয়ের ব্যাপারেও ‘হ্যাটট্রিক’ করেছেন।

আরও পড়ুন:
মিসরে মুরসির ৭৫ সমর্থকের মৃত্যুদণ্ড
ইন্দোনেশিয়ায় পর্যটন দ্বীপে ভূমিকম্পে নিহত ১০