Corporate Sangbad
নির্বাচিত কলাম

ফি নির্ধারণে নীতিমালা জরুরি, কম ফি নয়-মানসম্মত নিরীক্ষাই হোক প্রতিযোগিতার ভিত্তি

প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:১৫ অপরাহ্ন ·

দেশের পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর Corporate Governance Compliance Audit অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম, পরিচালকদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি, বোর্ড কমিটির কার্যকারিতা, আইন ও বিধিবিধান পরিপালন এবং সামগ্রিক করপোরেট সুশাসনের চর্চা মূল্যায়নের মাধ্যমে এ নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়। ফলে এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সনদ প্রদানের বিষয় নয়; বরং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা তৈরির অন্যতম মাধ্যম।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (BSEC) Corporate Governance Code, 2018-এর Condition No. 9 অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে প্রতিবছর একজন প্র্যাকটিসিং Chartered Accountant, Cost and Management Accountant অথবা Chartered Secretary-এর মাধ্যমে করপোরেট গভর্ন্যান্স পরিপালনসংক্রান্ত সনদ গ্রহণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীকে কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার বিধানও রয়েছে। অর্থাৎ আইনগতভাবেই এ কার্যক্রমে তিনটি পেশার অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত কার্যক্রমের জন্য এখনো Institute of Chartered Secretaries of Bangladesh (ICSB) কোনো সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক ফি নির্দেশিকা প্রণয়ন করেনি। ফলে কিছু Company Secretary (CS) ফার্ম অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে নিরীক্ষার কাজ গ্রহণ করছে। একইভাবে কিছু Chartered Accountancy (CA) ও Cost and Management Accountancy (CMA) ফার্মও তুলনামূলক কম ফিতে এ ধরনের কাজ করছে। এতে পেশাগত অঙ্গনে অস্বাস্থ্যকর মূল্য প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং নিরীক্ষার গুণগত মান বজায় রাখা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।

একটি মানসম্মত Corporate Governance Audit সম্পন্ন করতে কোম্পানির আকার, ব্যবসার প্রকৃতি, সম্পদ, টার্নওভার, পরিচালনা পর্ষদের কাঠামো, বিভিন্ন বোর্ড কমিটির কার্যক্রম, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ জন্য দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত সময়, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং পেশাগত বিচার-বিশ্লেষণ অপরিহার্য। কিন্তু অস্বাভাবিক কম পারিশ্রমিকে কাজ গ্রহণ করা হলে প্রয়োজনীয় সময় ও জনবল বিনিয়োগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে নিরীক্ষা অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্যায়নের পরিবর্তে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন বা সনদ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। ভারতের Institute of Company Secretaries of India (ICSI) তাদের Secretarial Audit Guidance Note-এ কোম্পানির আকার, প্রকৃতি এবং নিরীক্ষায় প্রয়োজনীয় শ্রম বিবেচনায় পারিশ্রমিক নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থা Australian Securities and Investments Commission (ASIC) নিরীক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু কম খরচকে প্রাধান্য না দিয়ে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, কারিগরি সক্ষমতা ও নিরীক্ষার মান বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা International Federation of Accountants (IFAC)-ও নিরীক্ষার গুণগত মান, পেশাগত দক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের পর্যাপ্ততার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

এ অবস্থায় ICSB-এর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। কোম্পানির সম্পদ, বার্ষিক টার্নওভার, ব্যবসার প্রকৃতি, ঝুঁকির মাত্রা ও নিরীক্ষার পরিধি বিবেচনায় একটি যৌক্তিক ও নির্দেশনামূলক ন্যূনতম ফি কাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ICAB ও ICMAB-এর সঙ্গে পেশাগত সমন্বয় গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি নিরীক্ষার কাজের পরিধি, ডকুমেন্টেশন, রিপোর্টিং এবং Quality Assurance নিশ্চিত করতে একটি অভিন্ন পেশাগত নির্দেশিকা প্রণয়ন করা সময়ের দাবি।

মনে রাখতে হবে, Corporate Governance Audit শুধু একটি Compliance Certificate সংগ্রহের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত দায়িত্ব। তাই এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা অবশ্যই থাকবে, তবে সেই প্রতিযোগিতার ভিত্তি হওয়া উচিত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নির্ভরযোগ্যতা ও সেবার গুণগত মান—শুধু কম ফি নয়।

পেশার মর্যাদা রক্ষা, নিরীক্ষার মান উন্নয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে ICSB-এর উদ্যোগে একটি বাস্তবসম্মত ফি নির্দেশিকা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

লেখক: মোহাম্মদ হারুন আর রশীদ, এফসিএমএ, এফসিএস।