সংঘাতের তীব্রতায় চারদিকে তখন ঘনিয়ে আসছিল বিভীষিকাময় অন্ধকার। বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি স্কুলের বয়লার রুমের নিচে—মাত্র ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটারের এক সংকীর্ণ গর্তে জবুথবু হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বসে ছিলেন ইউক্রেনীয় পদাতিক সেনা কনস্ট্যান্টিন ভ্লাসেনকো (৪৯)। বাঁচতে হলে তাঁকে নিতে হতো এমন এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, যা ভাবলেও শিউরে ওঠে গা—নিজের হাতে নিজের অবশিষ্ট পা-টি কেটে ফেলা!
সব বাধা আর নরকযন্ত্রণা সহ্য করে ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের এই সেনাদলপতি শুধু অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরেননি, বরং যুদ্ধক্ষেত্রের ইতিহাসে যুক্ত করেছেন এক নতুন অধ্যায়। ইউক্রেনের চরম যুদ্ধকবলিত ‘কিল জোন’-এ দীর্ঘ ৪৯১ দিন আটকে থাকার পর গত ৪ অক্টোবর বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবার আকাশপথে ড্রোন দিয়ে ঝুলিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে কোনো আহত সৈনিককে।
জীবন বাঁচাতে নিজের হাতে পা কাটার সিদ্ধান্ত
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের মে মাসে। খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসমরে বা ‘কিল জোনে’ ‘বাস্কি’ ছদ্মনামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে এক ডাগআউটে মোতায়েন করা হয় ভ্লাসেনকোকে। ড্রোনের মাধ্যমে ওপর থেকে ফেলে আসা রসদ সম্বল করে সেখানে দিন কাটছিল তাঁদের। কিন্তু শরৎকালে তাঁদের স্থলাভিষিক্ত করতে আসা চার ইউক্রেনীয় সেনাই রুশ হামলায় নিহত হলে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন তাঁরা।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তীব্র বন্যায় ডাগআউট ভেসে গেলে তাঁরা আশ্রয় নেন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলে। কিন্তু সেখানেও ঘনিয়ে আসে বিপর্যয়। রসদের পার্সেল আনতে গিয়ে রুশ ড্রোন হামলার শিকার হন তাঁরা। ৫০তম জন্মদিনের দিনেই নিহত হন বাস্কি, আর ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ও ডান পা ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় বয়লার রুমের ছোট্ট গর্তে আশ্রয় নেন ভ্লাসেনকো। সেখানে প্রায় তিন মাস ধরে পচে যেতে থাকা পায়ের তীব্র যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করেন তিনি। একপর্যায়ে যখন বুঝতে পারেন, কোনো চিকিৎসা ছাড়াই অবশ ও পচন ধরা পা নিয়ে কোনোভাবেই বেঁচে থাকা সম্ভব নয়, তখন নিজের পকেটের ছুরি বের করে কোনো অ্যানাস্থেসিয়া ছাড়াই কেটে ফেলেন নিজের পচে যাওয়া ডান পায়ের নীচের অংশ। রক্তপাত বন্ধ করতে কষে বেঁধে নেন ব্যান্ডেজ। দীর্ঘ আট মাস এই অন্ধকার গর্তেই লুকিয়ে ছিলেন তিনি।
যেভাবে সফল হলো বিশ্বের প্রথম 'ড্রোন উদ্ধার অভিযান'
যুদ্ধক্ষেত্রের এই 'কিল জোন' থেকে সাঁজোয়া যান বা গাড়ি পাঠিয়ে আহতদের উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ইউক্রেনীয় বাহিনীর উদ্ধারকারী দুটি চাকাযুক্ত যানও রুশ ড্রোনের হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। অবশেষে ইউক্রেনীয় সামরিক কমান্ডাররা আশ্রয় নেন এক অভিনব ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলের।
তারা কাজে লাগান ‘গুরজুফ ডিফেন্স’ নামক স্থানীয় এক প্রতিষ্ঠানের তৈরি ভারী-উত্তোলনকারী বিশাল এক 'সিক্স-কপ্টার' (ছয় পাখাবিশিষ্ট) ড্রোন। বড় পোকামাকড়ের মতো দেখতে এই ড্রোনটি ৯০ কেজি ওজন বহন করে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম।
উদ্ধার অভিযানের আগে ড্রোনের মাধ্যমে ভ্লাসেনকোর কাছে একটি মোবাইল ফোন, একটি বিশেষ হার্নেস (ঝুলন্ত বেল্ট) ও দিকনির্দেশনামূলক ভিডিও পাঠানো হয়।
গত ৪ অক্টোবর আসে সেই বহুল প্রতীক্ষিত ক্ষণ। ভ্লাসেনকো নিজেকে ড্রোনের সঙ্গে যুক্ত মেটাল কারাবিনারের সঙ্গে শক্ত করে আটকে নেন। মুহূর্তেই ড্রোনটি তাঁকে ৭০ মিটার (প্রায় ২৩০ ফুট) উঁচুতে তুলে আকাশে উড়াল দেয়। অভিযানটি সুরক্ষিত করতে অন্যান্য ইউক্রেনীয় ড্রোন ও কামান দিয়ে টানা দুই ঘণ্টা রুশ ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করা হয়, যাতে শত্রুপক্ষের মনোযোগ অন্যদিকে থাকে। তিনটি পাহারা ড্রোন মূল ড্রোনটিকে সুরক্ষা দিয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরে ইউক্রেনের নিরাপদ ঘাঁটিতে পৌঁছে দেয়।
"আমি নিজেকে আগেই কবর দিয়ে দিয়েছিলাম"
১৫ মিনিটের টানটান উত্তেজনাকর এই আকাশযাত্রা শেষ করে ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ভ্লাসেনকো। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ব্যান্ডেজ মোড়ানো পায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, "আমি নিজেকে আগেই কবর দিয়ে দিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল বেঁচে ফেরার আর কোনো আশাই অবশিষ্ট নেই।"
আকাশে ৭০ মিটার উঁচুতে ঝুলে থাকার সেই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে এই অভিজ্ঞ সৈনিক কিছুটা হেসে বলেন, "মাটিতে বা বনে পড়ে যাওয়ার ভয় আমার ছিল না। আমার একমাত্র ভয় ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া নিয়ে, কারণ আমি তো সাঁতার জানি না!"
ইউক্রেনীয় সামরিক কমান্ডারদের মতে, পাঁচ বছর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত আধুনিক যুদ্ধকৌশলকে আমূল বদলে দিয়েছে। ড্রোন ব্যবহার করে এত উঁচুতে ঝুলিয়ে ১৫ কিলোমিটার দূর থেকে সেনাকে উদ্ধার করার ঘটনা আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ইতিহাসে এটিই প্রথম। কনস্ট্যান্টিন ভ্লাসেনকোর এই বেঁচে থাকা কেবল এক সেনার জীবনের গল্প নয়, তা অদম্য মানবেতর মানসিকতা ও উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার এক অনন্য সংমিশ্রণ।