সরকারি-বেসরকারি নানা সেবা পেতে নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন নিয়ে চট্টগ্রামে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশোধনের ধরন অনুযায়ী আবেদনের যে ক্যাটাগরিতে যাওয়ার কথা, সেটি পরিবর্তন করে ভিন্ন ক্যাটাগরিতে পাঠানোর মাধ্যমে একটি চক্র নাগরিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে সংশোধনের ধরন অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। বিপরীতে সাধারণ আবেদনকারীদের অনেকের আবেদন দিনের পর দিন পড়ে থাকছে; এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যাটাগরিও নির্ধারণ হচ্ছে না।
এদিকে এনআইডি সংশোধন প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিক কার্যক্রমের অভিযোগে চট্টগ্রামের দুই নির্বাচন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গত ২৭ আগস্ট নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন বিভাগের উপপরিচালক মাহাবুবা আক্তার স্বাক্ষরিত আদেশে তাদের শোকজ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শোকজ পাওয়া দুই কর্মকর্তা হলেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং মীরসরাই উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির।
নির্বাচন কমিশন সূত্রের দাবি, কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিএমএস) ইউজার আইডি বিশ্লেষণ করে অফিস সময়ের বাইরে অস্বাভাবিক হারে ‘সিটিজেন ভিউ’ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র অনুযায়ী, মো. সাখাওয়াত হোসেনের ইউজার আইডি থেকে রাত ২টার পর ১ হাজার ৪২৬ বার এবং মো. হুমায়ুন কবিরের ইউজার আইডি থেকে ১ হাজার ১০৩ বার সিটিজেন ভিউ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—একজন কর্মকর্তা অফিস সময়ের বাইরে এত বিপুলসংখ্যক নাগরিক তথ্য কেন দেখেছেন এবং সংশ্লিষ্ট ইউজার আইডি অন্য কেউ ব্যবহার করেছেন কি না।
ক্যাটাগরি বদলে দেওয়ার অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এনআইডি সংশোধনের আবেদন পাওয়ার পর আবেদনের ধরন ও দাখিল করা কাগজপত্রের ভিত্তিতে সেটি কোন ক্যাটাগরিতে যাবে, তা নির্ধারণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় কোনো কোনো আবেদনকে নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ক্যাটাগরির পরিবর্তে অন্য ক্যাটাগরিতে পাঠানো হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দালালদের মাধ্যমে আসা আবেদনের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় দ্রুততা দেখানো হয়। দালালের পক্ষ থেকে এসএমএস বা অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘ক’ ক্যাটাগরির আবেদন ‘গ’ বা ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে এবং নির্ধারিত কর্মকর্তার পরিবর্তে অন্য কর্মকর্তার কাছে আবেদন পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এনআইডি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি দালাল চক্র কাজ করছে। তবে তার দপ্তরে এসব অনিয়ম করার সুযোগ নেই। তিনি বিধি অনুযায়ী ক্যাটাগরি নির্বাচন করেন বলেও দাবি করেন।
১০–৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দালালের মাধ্যমে এনআইডি সংশোধন করাতে সংশোধনের ধরন অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। সাধারণ পদ্ধতিতে আবেদন করলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলেও দালালের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রামের এক সাংবাদিক জানান, তিনি এনআইডিতে ছবি পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেও দীর্ঘদিন ক্যাটাগরি নির্ধারণ করাতে পারেননি। পরে এক দালাল দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন।
স্থানীয় একটি শিল্পকারখানার হিসাব কর্মকর্তা ফরহাদ জানান, স্ত্রী ও শ্যালকের ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য এনআইডি সংশোধনের আবেদন করেছিলেন। দীর্ঘদিনেও কাজ না হওয়ায় নির্বাচন অফিসের এক দালাল দুই আবেদনের জন্য ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে অন্য এক দালালের মাধ্যমে প্রতিটি আবেদন ৮ হাজার টাকা করে মোট ১৬ হাজার টাকায় সংশোধনের কাজ শেষ করেন বলে দাবি করেন তিনি।
শোকজের পরও প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম জেলায় এনআইডি সংশোধনের প্রায় সাড়ে চার হাজার আবেদন ক্যাটাগরি নির্ধারণের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে সাধারণ আবেদনকারীদের আবেদন যখন দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ, তখন কারা কীভাবে দ্রুত ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও সংশোধনের সুযোগ পাচ্ছেন—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মীরসরাই উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, বিষয়টি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তিনি শোকজের জবাব দিয়েছেন।
অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সারা দেশে সার্ভার সমস্যার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি বিধি অনুযায়ী ক্যাটাগরি নির্বাচন করেন।
তবে নির্বাচন কমিশনের আরেক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এমন অস্বাভাবিক ‘সিটিজেন ভিউ’ বা অনিয়মের তথ্য শুধু চট্টগ্রামেই পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি যাচাই করে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনার বেগম তাহমিদা আহমেদ বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে কমিশন ব্যবস্থা নেবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, কোনো সরকারি তদন্ত সংস্থার কাছে অভিযোগ থাকলে তারাও তদন্ত করতে পারে; কমিশনের কাছে তথ্য-প্রমাণ এলে কমিশনও বিষয়টি তদন্ত করবে।
চট্টগ্রামে এনআইডি সংশোধনকে কেন্দ্র করে দালালদের তৎপরতার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। তবে এবার ক্যাটাগরি নির্ধারণ, কর্মকর্তাদের ইউজার আইডিতে অফিস সময়ের বাইরে অস্বাভাবিক ‘সিটিজেন ভিউ’ এবং দুই কর্মকর্তাকে শোকজের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।