Corporate Sangbad
বিশেষ প্রতিবেদন

পদোন্নতি নিয়ে শিহাবের আপিল, ‘বিধিবহির্ভূত নয়’ বলছে চট্টগ্রাম বন্দর

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫২ পূর্বাহ্ন · নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী ব্যবস্থাপক (এস্টেট) মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিনের পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। শিহাব উদ্দিনের দাখিল করা অভিযোগ ও আপিল, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তার জবাব এবং পদোন্নতি কমিটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষের মতামতে বলা হয়েছে—তাঁকে পদোন্নতি থেকে বেআইনিভাবে বঞ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত আইনগত ও তথ্যগত ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ১২ আগস্ট ২০২৬ তারিখের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া বন্দরের মতামতে বলা হয়, শিহাব উদ্দিন মূলত জ্যেষ্ঠতা, মেধাক্রম, শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা এবং চাকরিকাল বিবেচনায় তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া উচিত ছিল বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগের অন্যতম বিষয় ছিল, তাঁকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কনিষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হান উদ্দিনকে ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯১-এর ১৫ নম্বর প্রবিধান অনুযায়ী শুধু জ্যেষ্ঠতার কারণে কোনো কর্মচারীর পদোন্নতির স্বয়ংক্রিয় অধিকার সৃষ্টি হয় না। পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, চাকরির রেকর্ড এবং উচ্চতর পদের দায়িত্ব পালনের উপযুক্ততাও বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের মতামতে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি কমিটি ফিডার পদ সম্পন্নকারী দুই প্রার্থীর তথ্য ও রেকর্ড পর্যালোচনা করে রায়হান উদ্দিনকে উচ্চতর পদের জন্য অধিকতর উপযুক্ত বিবেচনা করে তাঁর পক্ষে সুপারিশ করে। পরে যথাযথ কর্তৃপক্ষ সেই সুপারিশ অনুমোদন করে।

রায়হানের পক্ষে ৫টি ‘লেটার অব অ্যাপ্রিসিয়েশন’

শিহাব উদ্দিনের অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—তাঁর কাজের স্বীকৃতি অন্য কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে। এ অভিযোগের জবাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, কোনো কর্মকর্তার বিশেষ কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি দেওয়া কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার।

নথি পর্যালোচনায় রায়হান উদ্দিনকে ২০২৫ সালে চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পাঁচটি 'লেটার অব অ্যাপ্রিসিয়েশন’ দেওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বে-টার্মিনাল প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ, লালদিয়ার চর এলাকার অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, পানগাঁও আইসিটি প্রকল্পের জন্য জমি ইজারা, বে-টার্মিনাল প্রকল্পের খাস জমি রেজিস্ট্রি এবং বে-টার্মিনাল পিপিপি প্রকল্পের ট্রানজেকশন এডভাইজার (লেনদেন উপদেষ্টা বা লেনদেন বিষয়ক পরামর্শক)নিয়োগ-সংক্রান্ত কাজের স্বীকৃতির কথা উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়া সদস্য (প্রকৌশল) থেকেও রায়হান উদ্দিন ২০২৫ সালে আরও দুটি 'লেটার অব অ্যাপ্রিসিয়েশন’ পেয়েছেন বলে মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের নথিতে আরও বলা হয়েছে, রায়হান উদ্দিন ২০২৩ সালে সুইডেনের World Maritime University থেকে International Maritime Law বিষয়ে MSc ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিশেষ কর্মসম্পাদন প্রতিবেদনে তাঁর আনুগত্য, কর্মস্পৃহা ও বিশেষ যোগ্যতার উল্লেখ করে তাঁকে ‘দ্রুত পদোন্নতির যোগ্য’ হিসেবে মন্তব্য করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

নিয়োগের সময়ের মেধাক্রম নিয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা

শিহাব উদ্দিন তাঁর নিয়োগকালীন মেধাক্রমের বিষয়টিও অভিযোগে তুলে ধরেছেন। এর জবাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, প্রাথমিক নিয়োগের সময়ের মেধাক্রম এবং পরবর্তী পদোন্নতির সময়ের মূল্যায়ন এক বিষয় নয়।

কর্তৃপক্ষের মতে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে চাকরিকালীন কর্মদক্ষতা, চাকরির রেকর্ড, শৃঙ্খলা, সততা, অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগ্যতা এবং উচ্চতর পদের দায়িত্ব পালনের সামর্থ্য বিবেচনা করা স্বাভাবিক। ফলে নিয়োগ পরীক্ষায় কারও মেধাক্রম তুলনামূলক ভালো হওয়া মাত্রই পরবর্তী পদোন্নতির আইনগত নিশ্চয়তা তৈরি করে না।

চলতি দায়িত্ব প্রত্যাহারের কারণও ব্যাখ্যা করেছে বন্দর

ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) পদের চলতি দায়িত্ব থেকে তাঁকে অন্যায়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল—শিহাব উদ্দিনের এমন অভিযোগেরও জবাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নথিতে বলা হয়েছে, ৯ আগস্ট ২০২৩ সালে ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমানের অবসরজনিত কারণে শিহাব উদ্দিনকে ওই পদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়াসহ তাঁর কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে কর্তৃপক্ষ বিব্রত হয় এবং তাঁকে কয়েকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

এরপর ১২ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে পরিচালক (প্রশাসন)-এর দপ্তরাদেশের মাধ্যমে তাঁকে চলতি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মাতারবাড়ী, বে-টার্মিনাল ও পানগাঁও আইসিটির জমি অধিগ্রহণসহ নির্ধারিত কিছু কাজ সম্পন্নের দায়িত্ব দিয়ে সহকারী ব্যবস্থাপক (ভূমি) পদে নিযুক্ত করা হয়।

কর্তৃপক্ষের মতামতে বিষয়টিকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং তাঁর দায়িত্ব পরিবর্তনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার অভিযোগও নাকচ

শিহাব উদ্দিন বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা বৈরিতার ফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ অভিযোগের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে mala fide বা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রসূত প্রমাণ করতে সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন।

কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনায় পদোন্নতি কমিটি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রায়হান উদ্দিনকে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, পক্ষপাত বা অসৎ উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল—এমন কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আপিল নামঞ্জুরের সুপারিশ

সামগ্রিক পর্যালোচনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতামত হলো—শিহাব উদ্দিন পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় বিবেচিত হয়েছেন, শুধু জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই এবং পদোন্নতি কমিটি প্রার্থীদের সার্বিক যোগ্যতা ও উপযুক্ততা বিবেচনা করেছে।

কর্তৃপক্ষের মতে, রায়হান উদ্দিনের পদোন্নতির সুপারিশ যথাযথ কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেছে এবং তাঁকে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) পদে যোগদানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ফলে শিহাব উদ্দিনের অভিযোগ/আপিলের মাধ্যমে রায়হান উদ্দিনের পদোন্নতি আদেশকে অবৈধ বা বিধিবহির্ভূত প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত আইনগত ও তথ্যগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মতামতে বলা হয়েছে।

এ অবস্থায় শিহাব উদ্দিনের দাখিল করা আপিল নামঞ্জুর করে অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বহাল রেখে বিষয়টি নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

তবে পদোন্নতি নিয়ে শিহাব উদ্দিনের অভিযোগের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় উঠে আসা বিভিন্ন তথ্য—বিশেষ করে পদোন্নতি কমিটির মূল্যায়নের ভিত্তি, সাতটি স্বীকৃতিপত্রের বিষয়বস্তু এবং দুই কর্মকর্তার সার্ভিস রেকর্ডের তুলনামূলক মূল্যায়ন—নথিপত্রের আলোকে পৃথকভাবে যাচাইয়ের বিষয়ও রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা ও চিফ পারসোনাল অফিসার মো. নাসির উদ্দিন বলেন, 'শিহাব উদ্দিনের উত্থাপিত অভিযোগ ইতোমধ্যে দাপ্তরিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আপিল করেছেন। এ সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের চিঠিও বন্দর কর্তৃপক্ষ পেয়েছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ওই চিঠির জবাব যথাযথভাবে দেওয়া হবে।'