Corporate Sangbad
শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি

পেঁয়াজ সংরক্ষণে নতুন প্রযুক্তি আনছে বাকৃবি, বাঁচবে বৈদেশিক মুদ্রা, কমবে আমদানিনির্ভরতা

প্রকাশিত: ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ন · ময়মনসিংহ ব্যুরো

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক পেঁয়াজ সংরক্ষণে স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রযুক্তিনির্ভর পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও উপযুক্ত ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সংরক্ষণকালীন পচন, ওজন হ্রাস ও গুণগত মান কমে যাওয়ায় বছরের বিভিন্ন সময়ে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। ফলে চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপরও নির্ভর করতে হয়। এ থেকে রক্ষা পেতে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তিনির্ভর পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি)'র ওই গবেষকদল।

গবেষকদের দাবি, প্রযুক্তিটি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা গেলে সংরক্ষণকালীন পেঁয়াজের পচন ও ক্ষতি প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাকৃবির আইসিটি সেলের পরিচালক এবং কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মোঃ রোস্তম আলী। তাঁর সঙ্গে সহ-গবেষক হিসেবে কাজ করছেন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নাফিস সাদিক সায়েম ও স্নাতক শিক্ষার্থী রাহাত মিয়া।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) আর্থিক সহায়তায় ২০২৫ সালের মার্চ থেকে গবেষণাটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। বর্তমানে গবেষণাটি পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণ ও প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণের ধাপে রয়েছে।

গবেষকদের ভাষ্য, তুলনামূলক কম খরচে কার্যকর একটি স্বয়ংক্রিয় পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার তৈরি করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। পেঁয়াজ দীর্ঘদিন ভালো রাখতে সংরক্ষণাগারের তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

উদ্ভাবিত ব্যবস্থায় সংরক্ষণাগারের পরিবেশ পর্যবেক্ষণে বিশেষ সেন্সর ব্যবহার করা হয়। এসব সেন্সরের মাধ্যমে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরিবেশে প্রয়োজনের তুলনায় পরিবর্তন দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এয়ারফ্লো বা বাতাস চলাচলের ফ্যান চালু হওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এভাবে সংরক্ষণাগারের ভেতরে পেঁয়াজ রাখার উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে পচন ও অঙ্কুরোদগম কমানোর পাশাপাশি সংরক্ষণকালীন ক্ষতি কমিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়,কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২৫ এপ্রিল ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৪২ দশমিক ৬৪ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। বিপরীতে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ টন। এরপরও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৮৬ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়।

গবেষকদের প্রত্যাশা, আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে উৎপাদনের পর সংরক্ষণকালীন ক্ষতি কমবে। এতে বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের অপচয়ও কমানো সম্ভব হতে পারে।

গবেষণাটির প্রধান গবেষক অধ্যাপক ডঃ মোঃ রোস্তম আলী বলেন, গবেষণাটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল আশাব্যঞ্জক। পর্যাপ্ত সরকারি-বেসরকারি অনুদান, প্রয়োজনীয় সেন্সর ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে কৃষক ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী একটি পাইলট মডেল চালুর লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রযুক্তিটির সফল প্রয়োগ সম্ভব হলে পেঁয়াজের সংরক্ষণকালীন ক্ষতি কমানো এবং বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি হলে আমদানিনির্ভরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গবেষকরা মনে করছেন, দেশের পেঁয়াজ উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে কৃষক পর্যায়ে অপচয় কমানোর পাশাপাশি ভোক্তা পর্যায়েও স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।