Corporate Sangbad
অর্থ-বাণিজ্য

ইসিফরজে প্রকল্পের সাফল্য: সৃষ্টি হলো ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন ·

তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে হাতে নেওয়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফরজে)’ প্রকল্প দেশের অন্যতম সফল শিল্পোন্নয়ন উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, প্লাস্টিক এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প শুরুর সময় দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসত কেবল তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা অর্থনীতিকে নির্দিষ্ট একটি খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল করে তুলেছিল। এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনাময় চার খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নতুন রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা তৈরি করতেই ইসিফরজে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

প্রকল্প পরিচালক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বলেন, "প্রক্লপটি প্রায় সব প্রধান কর্মসম্পাদন সূচকেই নির্ধারিত লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি করেছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু রপ্তানি বৃদ্ধি নয়, বরং বাংলাদেশি শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।"

প্রকল্পের সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ ছিল ‘এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড (ইআরএফ)’। এই ম্যাচিং গ্রান্ট কর্মসূচির আওতায় নারী উদ্যোক্তাপ্রতিষ্ঠানসহ ৫৭০টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক মান অর্জন: পরিবেশ, সামাজিক ও গুণগত মান (ইএসকিউ) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষমতা অর্জন করেছে। উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২৬০টি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সনদ অর্জন করেছে।

বেসরকারি বিনিয়োগের ছোঁয়া: ইআরএফ তহবিলের মাধ্যমে বেসরকারি খাত থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি সহ-অর্থায়ন (কো-ইনভেস্টমেন্ট) এসেছে।

বিক্রি ও রপ্তানি বৃদ্ধি: প্রকল্পভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি ৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে (প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ১৫.৪%)। পাশাপাশি ২২টি নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে তারা।

রপ্তানিকারক বৃদ্ধি: প্রকল্প শুরুর আগে উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রপ্তানিকারকের হার ৫৯ শতাংশ থাকলেও তা বর্তমানে ৯৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং তাদের গড় রপ্তানি বেড়েছে ১৯২ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী: ৭৩টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, শিল্প অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতেও বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে ইসিফরজে প্রকল্প:

বিআইপিইটি: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিকস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বর্তমানে শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে।

সিইইটি ও ডিটিসিএলএফ: গাজীপুরের কালিয়াকৈরে 'সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (সিইইটি)' এবং কাশিমপুরে 'ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার (ডিটিসিএলএফ)'-এর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

নতুন ভবিষ্যতের প্রস্তুতি: মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রস্তাবিত 'ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইজিইটি)' এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে 'ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইআইজিইটি)'-এর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও সাইট উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য উন্নত প্রযুক্তিসেবা, পণ্য উন্নয়ন, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং কমপ্লায়েন্স বিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্পটি সরাসরি ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষকে উপকৃত করেছে, যার ৩৮ শতাংশই নারী। সার্বিকভাবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজারের প্রায় তিন গুণ।

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির আওতাভুক্ত তৈরি পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোর রপ্তানি প্রায় ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্পটির অন্যতম উদ্ভাবনী দিক ছিল আন্তর্জাতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অনুদান ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিশ্চিত করা, যা জবাবদিহিতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি কারিগরি সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করলে যে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক মানদণ্ড অর্জন করতে পারে, ইসিফরজে প্রকল্পের সাফল্য তারই উজ্জ্বল প্রমাণ।