যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শনিবার সকাল থেকেই রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে লাখ লাখ শোকাহত মানুষ সমবেত হয়েছেন।
আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরুর আগেই পুরো এলাকা শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে ভরে উঠেছে বলে এএফপির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, বিশাল এই কমপ্লেক্সের মূল প্রাঙ্গণ শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
এদিকে, জানাজাকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে কঠোর যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।
এএফপির আরেক সাংবাদিক জানান, অনেক মানুষ যানজট ও সড়ক নিয়ন্ত্রণের কারণে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে গ্র্যান্ড মোসাল্লায় পৌঁছান, যাতে তারা শেষবারের মতো প্রয়াত নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
খামেনির মৃত্যুতে ইরানজুড়ে কয়েকদিন ধরে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন শহর থেকে হাজারও মানুষ তেহরানে এসে শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।
৩৭ বছরের নেতৃত্বের অবসান, কিন্তু অশ্রু আর স্মৃতিতে এখনও অম্লান আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তেহরান থেকে মাশহাদ, শেষ বিদায়ের প্রতিটি পথ পরিণত হচ্ছে শোক, শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের মহাসমুদ্রে।
প্রয়াত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা খামেনির জানাজায় এক কোটির বেশি মানুষ অংশ নেবে বলে আশা করছে প্রশাসন। ১০০টির বেশি বিদেশি প্রতিনিধিদল শ্রদ্ধা জানালেও ইউরোপীয় দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানায়নি তেহরান।
খামেনি ইরানের জনগণের কাছে শুধু একজন নেতা নয়, বরং গৌরব, সাহস আর শক্তির এক প্রতীক। প্রাণের অভিভাবকের জানাযা ও রাষ্ট্রীয় বিদায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাজারো মানুষ।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতেই তেহরানের গ্রান্ড মোসাল্লায় আনা হয় খামেনির মরদেহ। শুক্রবার এক ঐতিহাসিক ও ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানে ইরানের তিনটি সরকারি শাখার প্রধানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি, সংসদীয় স্পিকার, বিশেষ দূত, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদরা শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এরপর একে একে সেখানে হাজির হন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিসহ শীর্ষ নেতারা। তারা নীরবে চোখের জলে দোয়া করেন প্রিয় নেতার জন্য। ইরানি কর্মকর্তা ও তাদের পরিবার, ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রতিনিধি, প্রতিরোধ ফ্রন্টের শহীদ পরিবার এবং আরব উপজাতীয় নেতারাও এই শ্রদ্ধা জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
শুধু ইরানের নেতারাই নন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং ইরানের মিত্রদের পরিবারও শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন। ভারতের শিখ ও হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের একটি প্রতিনিধিদলও খামেনির মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহর পরিবারের সদস্যরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রতিনিধি দল নিয়ে তিনি খামেনির মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানান এবং পরে ইরানের প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
তবে এবার ইউরোপীয় দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানায়নি তেহরান। ইরানের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছে, তাদের এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণের প্রশ্নই ওঠে না। ফলে খামেনির শেষ বিদায়ের আয়োজন শোকানুষ্ঠানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের রাজনৈতিক অবস্থান ও মিত্রতারও স্পষ্ট বার্তা হয়ে উঠেছে।
শোকযাত্রার প্রতিটি গন্তব্যই বহন করছে বিশেষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক তাৎপর্য। ক্ষমতার কেন্দ্র তেহরানের পর মরদেহ নেয়া হবে শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র কোমে, যেখানে অন্তত ২০ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এরপর ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষ গন্তব্য হবে মাশহাদ। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের মাজার এবং খামেনির জন্মস্থান হওয়ায় সেখানে আরও প্রায় ৪০ লাখ মানুষের অংশগ্রহণের আশা করছে ইরান।