পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা প্রত্যেক সন্তানের আইনগত দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে বা তা অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে বাংলাদেশে। ২০১৩ সালে প্রণীত ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ এবং পরবর্তীতে ২০২৩ সালের বিধিমালার আলোকে প্রবীণদের এই আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
আইনে ‘পিতা-মাতা’ ও ‘ভরণ-পোষণ’-এর সংজ্ঞা
‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী, ‘পিতা’ বলতে সন্তানের জনক এবং ‘মাতা’ বলতে সন্তানের গর্ভধারিণীকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘ভরণ-পোষণ’ বলতে মূলত পাঁচটি মৌলিক ও মানবিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে:
*খাওয়া-দাওয়া ও বস্ত্রের জোগান।
*প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিয়মিত পরিচর্যা।
*নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা।
*সন্তানদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সঙ্গ ও সময় প্রদান।
আইনের গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ
আইনের ৩ ধারা: সন্তানের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব
প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই দায়িত্ব বণ্টন করে নেবেন।
পিতা-মাতাকে একই স্থানে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনোভাবেই বৃদ্ধনিবাস বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করা যাবে না।
পিতা-মাতা আলাদাভাবে বসবাস করলে, সন্তানের দৈনিক বা মাসিক আয় থেকে একটি যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত তাদের প্রদান করতে হবে।
আইনের ৪ ধারা: দাদা-দাদী ও নানা-নানীর অধিকার
পিতার অনুপস্থিতিতে দাদা-দাদী এবং মাতার অনুপস্থিতিতে নানা-নানীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব সরাসরি নাতি-নাতনির ওপর বর্তাবে। এই দায়িত্বও পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের অংশ হিসেবেই গণ্য হবে।
অপরাধ ও শাস্তির বিধান (৫ ধারা)
আইনের ধারা ৫(১): কোনো সন্তান ৩ বা ৪ ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং তা অনাদায়ে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
ধারা ৫(২) (সহায়তাকারীর দণ্ড): কোনো সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণে বাধা দেন বা অসহযোগিতা করেন, তবে তাকেও অপরাধের সহায়তাকারী হিসেবে একই দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
এই আইনটিকে বাংলাদেশের পারিবারিক মূল্যবোধ ও প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন।
আইনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, "আইনের ৪ ধারার মাধ্যমে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নাতি-নাতনির ওপর অর্পণ করে মূলত তিন প্রজন্মের পারিবারিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। এছাড়া ৩ ধারায় বৃদ্ধনিবাসে পাঠানো নিষিদ্ধ করে পারিবারিক বন্ধনকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।"
অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন আরও জানান, আপোষ-মীমাংসার সুযোগ (৮ ধারা): আইনের ৮ ধারায় আদালতের বাইরে স্থানীয়ভাবে আপোষ-মীমাংসার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
২০২৩ সালের নতুন বিধিমালা: ২০২৩ সালের বিধিমালায় ‘ভরণ-পোষণ তহবিল’ ও ‘পরিচর্যাকেন্দ্র’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যা অসহায় প্রবীণদের জন্য নতুন আশার আলো।
আইনজীবী খালিদ হোসাইন মনে করেন, এই আইনটি শুধু সন্তানদের শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং তাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। আইনটি সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বাড়লে পারিবারিক সম্প্রীতি আরও দৃঢ় হবে এবং প্রবীণরা সমাজে তাদের প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা পাবেন।