Corporate Sangbad
আইন-আদালত

মৃত্যুর ৩০ বছর পর সালমান শাহর মরদেহ উত্তোলনের আদেশ বাতিল

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ন ·

বহুল আলোচিত বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর পর তাঁর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের আদেশ বাতিল করেছেন আদালত।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালতে মামলার বাদী মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম এই আদেশ বাতিলের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক আবেদনটি মঞ্জুর করে পূর্বের আদেশটি বাতিল করেন।

বাদী পক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "এত দীর্ঘ সময় পর লাশ উত্তোলন করে নতুন কোনো তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাছাড়া বিষয়টি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে এবং হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা সংঘর্ষের সৃষ্টি করতে পারে। এসব দিক বিবেচনা করেই আমরা লাশ উত্তোলনের সিদ্ধান্ত বাতিলের আবেদন জানাই।"

আদালতে পেশ করা আবেদনে উল্লেখ করা হয়, সালমান শাহকে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়েছে। এই অবস্থায় পুনরায় লাশ উত্তোলন করা হলে ভক্ত ও স্থানীয়দের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার পাশাপাশি ব্যাপক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সালমান শাহর মা নীলুফা জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী) এবং মামা মো. আলমগীর কুমকুমের এ বিষয়ে তীব্র আপত্তি থাকায় আদালতের এই আদেশটি প্রত্যাহার করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

এর আগে, গত ২০ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. জিয়াউল মোর্শেদ ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল রিপোর্টের জন্য লাশ উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের আবেদন করেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৪ মে আদালত লাশ উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছিলেন।

এর আগে গত ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলার এজাহার গ্রহণ করে তদন্ত কর্মকর্তাকে আগামী ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার আসামিরা হলেন— সামিরা হক, লতিফা হক লুসি, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, চলচ্চিত্র অভিনেতা ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।

এর আগে, চলতি বছরের ২০ মে আদালতে এই আবেদনটি করেছিলেন সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার বাদী মো. আলমগীর (৬৮) সালমান শাহর মা নিলুফা জামান চৌধুরী নীলা চৌধুরীর পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে মামলাটি পরিচালনা করছেন। এজাহার অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাদী মো. আলমগীর, তার বোন নীলা চৌধুরী, ভগ্নিপতি মৃত কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটন রোডের 'ইস্কাটন প্লাজা'র ১১/বি নম্বর বাসায় সালমান শাহর সাথে দেখা করতে যান।

সে সময় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হক এবং কর্মচারী আবুল তাদের জানান যে সালমান ঘুমাচ্ছেন। এরপর তারা গ্রিন রোডের বাসায় ফিরে আসার পর, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সালমান শাহর বাসা থেকে টেলিফোনে জানানো হয় যে সালমানের কিছু একটা হয়েছে, যেন তারা দ্রুত আসেন। খবর পেয়ে তারা দ্রুত ইস্কাটন প্লাজার বাসায় গিয়ে দেখেন, সালমান শাহ তার শয়নকক্ষে খাটের উপরে নিথর ও অবশ অবস্থায় পড়ে আছেন। সে সময় কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।

সালমান শাহর মা চিৎকার করে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ জানালে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, হাসপাতালে নেওয়ার পথে তারা সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রথম দফা ময়নাতদন্ত শেষে সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার প্রাঙ্গণ কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলা:
সালমান শাহর বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী তার মৃত্যুর আগে থেকেই এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করে আসছিলেন। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি দরখাস্ত দাখিল করেন, যেখানে রমনা থানার অপমৃত্যু মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পর থেকে সালমানের মামা মোহাম্মদ আলমগীর বোনের পক্ষ হয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদী পক্ষের করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে, গত বছরের ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যেখানে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় (পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও পারস্পরিক সহযোগিতা) অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার প্রধান আসামিরা হলেন- সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হক, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও শিল্পপতি আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, চলচ্চিত্র অভিনেতা (খলনায়ক) ডন, ডেবিট, জাভেদ. ফারুক. মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস সাত্তার, সাজু, রেজভি আহমেদ ফরহাদ (১৭)। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাতনামা আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করে থাকলে, তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে তারা আইনি দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন।