ধর্ষক বা মাদক ব্যবসায়ীরা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ হতে পারে না উল্লেখ করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান বলেছেন, “এদের দমনে যদি কোনো রাজনৈতিক নেতা তদবির করেন, তবে সেই নেতাসহ তাদের একই মামলায় জড়িয়ে হাজতে পাঠানো হবে। আমার নিজের দলের নেতা হলেও রেহাই পাবেন না।” মাদক ও ধর্ষণের বিষয়ে সরকার কোনো আপস করবে না এবং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
দুর্নীতিবাজদের সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, “আপনি যতো গোপনেই দুর্নীতি করেন না কেন, সরকার তা নজরদারি করছে। রাষ্ট্রের এখন অনেকগুলো চোখ, যা এড়ানো অসম্ভব।”
তিনি আরও জানান, মেধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সব শূন্যপদে নিয়োগ দেওয়া হবে এবং কোনো রাজনৈতিক তদবির সেখানে বাধা হতে পারবে না।
সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মক্ষেত্রে অবহেলার সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী বলেন, “দেশের প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টায় অফিস করেন। কিন্তু জেলা ও উপজেলার অনেক সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে এখনও অফিসে আসার অনিহা রয়েছে। কর্মকর্তারা যদি স্ব-স্ব স্থান থেকে নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তাহলে সমাজ বা রাষ্ট্রে কোনো সংকট থাকবে না।” তিনি কর্মকর্তাদের দক্ষতা (এফিসিয়েন্সি) বাড়ানোর এবং জনভোগান্তি কমানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, এক ছাতার নিচে সব সেবা নিশ্চিত করতে সরকার ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের মেগা প্রজেক্টের দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিস্ট আমলে পৌনে ৪ কিলোমিটার রাস্তা করতে প্রথমে ৬০-৭০ কোটি টাকা এবং পরে তা বাড়িয়ে ২৮০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছিল। আমরা যাচাই-বাছাই করে দুর্নীতি পাওয়ায় একনেক বৈঠকে সেটি স্থগিত করেছি। রাষ্ট্রের টাকা বেশুমার লুটপাট ও বিদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা পাচার বন্ধে এখন প্রকল্পগুলোর বাস্তবতার মূল্যায়ন করা হচ্ছে।”
সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, “মাদক ব্যবসায়ীরা এখন স্মার্ট হয়ে গেছে, তারা সীমান্তে মাদক পাচারে ড্রোন ব্যবহার করছে। আদালতে আইনি ফাঁকফোকর গলাতে তারা অল্প পরিমাণে (১০/১৫ পিস) মাদক বহন করে, যার ফলে বিচারকরা পরিমাণের দিকে তাকিয়ে সহজে জামিন দিয়ে দিচ্ছেন।”
তবে মাদক ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রের নীতি-নৈতিকতাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এদের দমনে সরকার আরও কঠোর হবে। একই সঙ্গে তিনি কালীগঞ্জের চাঞ্চল্যকর শিশু তাবাসসুম ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের একটি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী বলেন, “ ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ৬০ কিলোওয়াট সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন করে ঝিনাইদহ সারা দেশের মধ্যে প্রথম নজির স্থাপন করেছেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ব্যবহারের পর এখান থেকে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। ঝিনাইদহের এই মডেল সারা দেশে চালু করা হবে, যা শিল্প-কারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের চাপ কমাতে সাহায্য করবে।”
চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “এই বাজেট অত্যন্ত চিন্তাশীল, সুদূরপ্রসারী, উচ্চাভিলাষী এবং জনকল্যাণের বাজেট। বিএনপি দেশ ও জনগণের রাজনীতি করে বলেই এই বাজেট নিয়ে রাজপথে কোনো মিছিল-মিটিং করতে পারেনি বিরোধী দল। আর মদ ও সিগারেটের দাম বৃদ্ধিতে যারা মিছিল-মিটিং করেন, তারা মূলত বোকার স্বর্গে বাস করছেন।” তারা মুলত বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা করেছেন।আইনমন্ত্রী এর আগে ঝিনাইদহ পৌরসভা এলাকায় ১১ কোটি টাকা ব্যায় নির্মিত অত্যাধুনিক কসাইখানা ও বিকালে শৈলকুপা উপজেলার বারইপাড়া স্কুল মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসুচির উদ্বোধন করেন।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মোঃ নোমান হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সভাপতি আসিফ ইকবাল, বীর মুক্তিযোদ্ধা কামালুজ্জামান, চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন, জেলা বিএনপি সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা, সিভিল সার্জন ডাঃ কামরুজ্জামান সোহেল, বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল আলম, জেলা পরিষদের প্রশাসক এম এ মজিদ এবং পুলিশ সুপার মিয়া মোঃ আশিস বিন হাসান।
সভায় জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, সুধী সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।