Corporate Sangbad
খেলাধুলা

ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ও ২০০ ম্যাচের অনন্য মাইলফলক

প্রকাশিত: ১৬ জুন, ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ন · স্পোর্টস ডেস্ক

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে পারতেন লিওনেল মেসি। তবে সব জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে তিনি আবারও ফিরেছেন। এবারের আসরে মাঠে নামার মাধ্যমে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনন্য রেকর্ডের পথে রয়েছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।

চার বছর আগে এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, কাতার বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। মরুভূমির বুকে নিজের জাদুকরী নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে সোনালী ট্রফিও এনে দিয়েছিলেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে করেছিলেন ৭টি গোল, যার মধ্যে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই রোমাঞ্চকর ফাইনালের দুটি গোলও ছিল।

ঐতিহাসিক সেই জয়ের পর মেসি বলেছিলেন, “স্পষ্টতই, আমি আমার ক্যারিয়ার এভাবেই শেষ করতে চেয়েছিলাম। এর চেয়ে বেশি কিছু আর চাওয়ার নেই।”

তখন ফুটবল বিশ্বের সবারই মনে হয়েছিল, এটাই হয়তো মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। তবে এ মাসের শেষ দিকে ৩৯ বছরে পা দিতে যাওয়া এই ক্ষুদে জাদুকর পরে স্বীকার করেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেশের জার্সিতে আরও কিছুদিন খেলে যেতে চান তিনি। শেষ পর্যন্ত ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের আকর্ষণ এড়াতে পারেননি মেসি; খেলা চালিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। গত মাসে কোচ লিওনেল স্কালোনি ঘোষিত ২৬ সদস্যের দলেও যথারীতি রয়েছে তার নাম।

তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবার মাঠে নামছে টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দেশ টানা দুবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। আলবিসেলেস্তেরা এবার সেই খরা কাটাতে মরিয়া।

গত সপ্তাহে আলাবামায় আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানে জয়ের পর মেসি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “শুরু থেকেই আমি পুরো প্রক্রিয়াটি উপভোগ করছি। আমি খুশি, প্রতিটি মুহূর্ত দারুণ কাটছে এবং আগের মতোই রোমাঞ্চিত বোধ করছি।”

কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি খেলবেন কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধোঁয়াশা ছিল। নিজের সংশয়ের কথা জানিয়ে মেসি বলেন,

“আগের বিশ্বকাপের পর মনে হয়েছিল, এত বছর পর আবার খেলাটা কঠিন হবে। তাই কিছুটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি ভালো অনুভব করতে শুরু করি এবং প্রতিদিন এক ধাপ করে এগিয়েছি। খেলার সুযোগ পেয়েছি, ছন্দ ফিরে পেয়েছি, নিয়মিত মাঠে থেকে নিজেকে ফিট রেখেছি। সবকিছুই খুব স্বাভাবিকভাবে ঘটেছে।”

এটি স্পষ্ট যে মেসি এখন আর তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়ের গতিতে নেই। ২০২৩ সালে পিএসজিতে দুই মৌসুমের হতাশাজনক অধ্যায় শেষ করে ইউরোপীয় ফুটবল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। বর্তমানে মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ক্লাব ইন্টার মিয়ামির হয়ে খেলছেন। ফলে ইউরোপের সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে এখন আর তাকে প্রতি সপ্তাহে দেখা যায় না।

তবুও বুড়ো বয়সে মেসির ফর্ম চোখে পড়ার মতো। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১৬ ম্যাচে করেছেন ১৩ গোল। গত বছর ইন্টার মিয়ামি কোপা এমএলএস কাপ জেতাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। গত মাসে ফিলাডেলফিয়ার বিপক্ষে ৬-৪ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে হ্যামস্ট্রিং সমস্যার কারণে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়লে তার ফিটনেস নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ২০ মিনিট মাঠে নেমে পেনাল্টি থেকে গোল করে সেই শঙ্কা অনেকটাই দূর করেছেন তিনি।

আটবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী মেসি কাতার বিশ্বকাপের পরও আর্জেন্টিনার হয়ে সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছেন। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় অধিনায়ক হিসেবে দলকে শিরোপা জেতান তিনি। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা।

ফুটবল নিয়ে নিজের তাড়না প্রসঙ্গে সম্প্রতি মেসি বলেন, “আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি, এবং যতদিন শরীর সায় দেবে, ততদিন খেলব।”

২০০৬ সালে জার্মানিতে যখন মেসি তার প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন, তখন তিনি ছিলেন এক কিশোর। এরপর ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নেতৃত্ব দিলেও অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল তার।

আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসি মঙ্গলবার কানসাস সিটিতে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ২০০তম ম্যাচ খেলতে মাঠে নামবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আর এটি হলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং কুয়েতের বাদের আল-মুতাওয়ার পর বিশ্বের তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করবেন তিনি।

মজার ব্যাপার হলো, মেসির দীর্ঘদিনের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও পর্তুগালের হয়ে এবার নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছেন। দুই মহাতারকার এই শেষ নৃত্য দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।