Corporate Sangbad
সম্পাদকীয়

সংকট উত্তরণ নাকি গতানুগতিকতার বৃত্তে বন্দি?

প্রকাশিত: ১৩ জুন, ২০২৬, ১:০৮ অপরাহ্ন ·

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট হিসেবে সাধারণ মানুষ এবং অর্থনীতিবিদদের মাঝে এটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল ছিল। কারণ এবারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অংকের দিক থেকে যা দেশের ইতিহাসের রেকর্ড। 

বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং রাজস্ব আদায়ের মন্থর গতির পটভূমিতে এই বাজেটটি প্রণীত হয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে— এই বাজেট কি বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দিতে পেরেছে, নাকি এটিও এক বছরের গতানুগতিক হিসাব-নিকাশের বৃত্তেই বন্দি রয়ে গেল?

সংকটের বাস্তবতা ও বাজেটের লক্ষ্য
একটি বাজেট তখনই সফল হয়, যখন তা দেশের সমসাময়িক প্রধান অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোকে সরাসরি আঘাত করতে পারে। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষত হচ্ছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, তখন অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, প্রস্তাবিত নীতিমালায় এর প্রতিফলন কতটা বাস্তবসম্মত?

জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখার চেয়ে এই মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়াটাই হওয়া উচিত ছিল প্রধান লক্ষ্য। বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের বিপুল পরিমাণের ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করতে পারে। আর বেসরকারি খাত সংকুচিত হলে কর্মসংস্থান তৈরিতে স্থবিরতা দেখা দেবে, যা সাধারণ মানুষের সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।

রাজস্ব আদায়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রতিবছরের মতোই এর দুর্বল রাজস্ব কাঠামো। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) জন্য যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, বর্তমান কর-জিডিপি অনুপাত (Tax-to-GDP ratio) বিবেচনায় তা কতটা অর্জনযোগ্য, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

কর জালের বিস্তার: নতুন করদাতা তৈরি না করে বারবার বিদ্যমান করদাতাদের ওপরই করের বোঝা চাপানো হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

পাচার ও খেলাপি ঋণ: অর্থ পাচার রোধ, হুন্ডি ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের যে তাগিদ দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিবিদরা দিয়ে আসছিলেন, বাজেটে তার শক্তিশালী কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাত
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের বাজেট পরিমাপ করা হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দের ওপর ভিত্তি করে। মেগা প্রজেক্ট বা ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে এবার বেশি নজর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা এবং ভাতার পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো হলেও, বর্তমান বাজারদরের সাথে তা একেবারেই অসঙ্গতিপূর্ণ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির তুলনায় বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে এখনও অনেক কম।

আমাদের প্রত্যাশা
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি 'বিলাসী' বা 'উচ্চাকাঙ্ক্ষী' বাজেটের চেয়ে একটি 'বাস্তবসম্মত ও সংস্কারমুখী' বাজেট বেশি জরুরি ছিল। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংকটের কথা স্বীকার করেছেন, যা ইতিবাচক। কিন্তু রোগ নির্ণয় করার পর যদি সঠিক ওষুধ প্রয়োগ না করা হয়, তবে রোগী সুস্থ হয় না।

আমরা আশা করি, জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের আগে প্রস্তাবিত কর কাঠামো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলো নিয়ে আরও বিশদ ও যৌক্তিক আলোচনা হবে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় তৈরি এই বাজেট যেন কেবল গুটিকয়েক সুবিধাভোগীর স্বার্থ রক্ষা না করে, বরং দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের স্বস্তি ফিরিয়ে আনার হাতিয়ার হয়— এটাই আমাদের প্রত্যাশা।