বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ডানহাতি অফস্পিনার নাঈম হাসানকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে নামিয়ে রাস্তায় বেধড়ক মারধর এবং পরবর্তীতে থানায় নিয়ে হেনস্তা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
শুক্রবার (১২ জুন) রাত সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে।
এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে খুলশী থানার এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) তিন পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ভুক্তভোগী ক্রিকেটারের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ক্রিকেটার নাঈম হাসান জানান, ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগের (ডিপিএল) খেলা শেষ করে শুক্রবার রাতে তিনি বিমানে করে চট্টগ্রামে পৌঁছান। ফ্লাইট বিলম্বের কারণে রাত ১০টা ২০ মিনিটে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে নিজের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। অটোরিকশাটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছালে খুলশী থানার পুলিশের একটি দল গাড়িটির গতি রোধ করে।
নাঈম হাসানের অভিযোগ, গাড়ি থামানোর পরপরই ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র কেড়ে নেন এবং তাকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করেন। এ সময় নাঈম নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন এবং নিজের অফিশিয়াল পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেখান।
পরিচয় দেওয়ার পরেও ঘটনাস্থলে থাকা খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম লাঠি দিয়ে নাঈমের কোমরে সজোরে আঘাত করতে থাকেন। একই সাথে পুলিশের ওই এসআইয়ের সঙ্গে থাকা সাদা পোশাকের এক ব্যক্তি (পুলিশের সোর্স সোহেল) পাইপ দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি পেটাতে শুরু করেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাঈম হাসান বলেন, “ঘটনাস্থলে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়ে আমি যে একজন ক্রিকেটার, সেই পরিচয় দিলেও পুলিশ মারধর থামায়নি। উল্টো তারা বলছিল— তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না। তারা আমার গলা চেপে ধরেছিল এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছিল।”
মারধরের একপর্যায়ে পুলিশের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও তাকে একটি সাধারণ অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পরবর্তীতে নাঈম হাসানকে খুলশী থানায় নিয়ে ওসির কক্ষে হাজির করা হয়। নাঈমের দাবি, ওসির কক্ষেও তাকে হেনস্তা করা হয়। তিনি যখন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানকে ঘটনার বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন, তখন ওসি বারবার ধমকের সুরে তাকে চোখ নিচু করে কথা বলতে বলেন। পরবর্তীতে ওপর মহল থেকে একটি ফোন আসার পর ওসির আচরণ শান্ত হয়।
থানায় মোবাইল ফোন ফেরত পাওয়ার পর নাঈম হাসান দ্রুত বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালকে বিষয়টি জানান। তামিম ইকবাল বিসিবির পরিচালক ইসরাফিল খসরুকে জানালে ক্রিকেট বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন এবং নাঈমকে আশ্বস্ত করেন। এরপর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমান জানান, এসআই শফিকুল ইসলাম চোরাচালানের একটি তথ্যের ভিত্তিতে ওসির অনুমতি ছাড়াই এই অভিযানে গিয়েছিলেন। থানায় আনার পর ক্রিকেটারের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেলসহ তিনজনকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্লোজড করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. আমিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, একটি অটোরিকশার মাধ্যমে সোনা চোরাচালানের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে অভিযানে গিয়েছিল। তবে তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং অভিযান যথাযথ নিয়ম মেনে হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কোনো অনিয়ম সহ্য করব না। পুলিশিং প্রক্রিয়ায় কাউকে মারধর করার কোনো সুযোগ নেই। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাঈমকে মারধরের খবর পেয়ে রাতেই থানায় ছুটে যান তার বাবা সাবেক কাউন্সিলর মাহবুবুল আলম। তিনি অভিযোগ করেন, থানায় আসার পর ডিউটি অফিসারও তার সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেছেন।
এদিকে শনিবার (১৩ জুন) সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও পুলিশ সোর্স সোহেলকে আসামি করে মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্ন তুলে ক্রিকেটার নাঈম হাসান বলেন, “আজকে আমার সাথে হয়েছে, আমার জন্য অনেক লোক থানায় এসেছে। কিন্তু অন্য সাধারণ লোকের জন্য কেউ থানায় আসবে না। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই, যাতে আর কাউকে এভাবে হয়রানির শিকার হতে না হয়।”